ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও চাপ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহে অস্থিরতার কারণে দেশে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এই সংকটের পেছনে শুধু বৈশ্বিক প্রভাব নয়, দেশের ভেতরে অবৈধ মজুত ও সিন্ডিকেটের কার্যক্রমও বড় ভূমিকা পালন করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাস ও চলতি এপ্রিলের ২ তারিখ পর্যন্ত ২২ জেলার ৩০টি স্থানে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের তথ্য পাওয়া গেছে। এই সংখ্যাটি মাত্র এক সপ্তাহে বেড়ে এসেছে; ১৭ মার্চ পর্যন্ত ১৭ জেলায় তেলের মজুত ধরা পড়েছিল। পুলিশের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ মজুতদারি, পাচার এবং সরবরাহের অসঙ্গতি জনজীবনে বড় ধরণের ভোগান্তি তৈরি করছে।
পুলিশ ও র্যাবের অভিযানগুলো ইতোমধ্যেই প্রভাব ফেলছে। ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ২৯টি অভিযানে প্রায় ৪০,০০০ লিটার ডিজেল ও পেট্রোল জব্দ করা হয়েছে। মোবাইল আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই সঙ্গে, জব্দ করা জ্বালানি সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নিচে অবৈধ মজুতের জেলায় তথ্য সংক্ষেপে দেওয়া হলো—
| জেলা |
অবৈধ মজুতের সংখ্যা (স্থান) |
| কক্সবাজার |
২ |
| গাইবান্ধা |
১ |
| শরীয়তপুর |
১ |
| সাতক্ষীরা |
১ |
| চাঁপাইনবাবগঞ্জ |
১ |
| চট্টগ্রাম মহানগর |
২ |
| ময়মনসিংহ |
১ |
| কুড়িগ্রাম |
১ |
| দিনাজপুর |
১ |
| পাবনা |
১ |
| মেহেরপুর |
১ |
| মাদারীপুর |
১ |
| নেত্রকোনা |
১ |
| জামালপুর |
১ |
| চট্টগ্রাম |
১ |
| বাগেরহাট |
১ |
| ফরিদপুর |
১ |
| নারায়ণগঞ্জ |
১ |
| নড়াইল |
১ |
| গাজীপুর |
১ |
| ভোলা |
১ |
| রাজশাহী |
১ |
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৬৫–৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, যা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের প্রকৃত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও অবৈধ মজুত ও সিন্ডিকেটের কারণে সরবরাহ স্থগিত করা হচ্ছে, যা জনভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার ইতিমধ্যেই জ্বালানি মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে কঠোর বার্তা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান চলছে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। মাঠ পর্যায়ে কঠোর ও নিয়মিত তদারকি, রিফাইনারি ও কনডেনসেট সরবরাহের স্বচ্ছ যাচাই এবং বেসরকারি আমদানিতে কারসাজি রোধ প্রয়োজন। তেল থাকার পরও “তেল নেই” বলার মতো কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ করতে হলে প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে সার্বক্ষণিক তদারকি জরুরি।
সবমিলিয়ে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মজুতদারি চিহ্নিতকরণ, কঠোর আইন প্রয়োগ ও মাঠ পর্যায়ের নজরদারি একান্ত প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল আছে, তবে সঠিকভাবে সরবরাহ নিশ্চিত না হলে জনগণের ভোগান্তি ও সিন্ডিকেটের প্রভাব অব্যাহত থাকবে।