খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 21শে চৈত্র ১৪৩২ | ৪ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
জীবনে চলার পথে একটা অদ্ভুত সময়ে উপনীত হয়েছি। যখন নিজের কাছেই প্রশ্ন জাগে স্বপ্ন ছোট হয়ে যাচ্ছে নাকি সাহস কমে যাচ্ছে? এই প্রশ্নটা এখন প্রায়শই মাথায় ঘুরপাক খায়। কিন্তু কেন এমন হয়? কেন বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের স্বপ্নগুলো সংকুচিত হতে থাকে?
আমার ধারণা বয়স বাড়ার সাথে সাথে জীবনের সমীকরণটা জটিল হয়ে যায়। দায়িত্ব বাড়ে—বৃহত্তর পরিবারের পাশাপাশি নিজের পরিবার, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়ি ভাড়া সংশ্লিষ্ট নানাবিধ খরচ, বাজারঘাট, পরিবহণ, ইএমআই, চিকিৎসা খরচ ইত্যাদি। তালিকাটা যত লম্বা হয়, স্বপ্নের জায়গাটা যেন ততই ছোট হতে থাকে। এক্ষেত্রে সমাজও আমাদের স্বপ্নকে অনেকটা রিসাইজ করে বয়স অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ড দাঁড় করিয়ে ‘উচিত’ বা ‘অনুচিত’ এর একটা সীমারেখা টেনে দেয়। পঁচিশে চাকরি, ত্রিশে বিয়ে, পঁয়ত্রিশে সন্তান, চল্লিশে একটা বাড়ি—এই হলো সফলতার টাইমলাইন। অতএব, যা কিছু এর মধ্যেই যেন সবাই করে ফেলে।
নির্দিষ্ট টাইমলাইনের এই চাপটা আমাদের স্বপ্নকে ছাঁচে ফেলে দেয়। নিজের ইচ্ছার চেয়ে সমাজের প্রত্যাশা বড় হয়ে ওঠে। আর তুলনার সংস্কৃতি তো আছেই। এ বন্ধু ও বন্ধুর কোটি টাকার গাড়ি বাড়ি, ফেসবুকে বন্ধুর ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ, লিংকডইনে সহপাঠীর পদোন্নতি—এসব দেখে মনে হয়, আমিই শুধু পিছিয়ে আছি। এই তুলনা, এই চাপ, এই অদৃশ্য নিয়মকানুন—সব মিলিয়ে আমাদের স্বপ্নকে রিসাইজ করে ফেলে। যা ছিল একসময় বিশাল, তা হয়ে যায় নিরাপদ।
সমাজ এটাও শিখিয়ে দেয়—২৫-৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত এক চাকরি ছেড়ে অন্য চাকরিতে যাওয়া বা ব্যবসা-বাণিজ্য করা একটা রোমাঞ্চ। কিন্তু চল্লিশ বা তদূর্ধ্ব? তখন এটাকে বোঝানো হয় পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে জুয়া খেলা। ফলে ব্যর্থতার মূল্য বেড়ে যায়। বুঝিয়ে দেয়া হয় ব্যর্থ হলে শুধু নিজে নয়, সাথে থাকবে আরও কয়েকজন যারা কেবল আমার উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। আর তাই নিরাপত্তা হয়ে ওঠে অগ্রাধিকার। স্বপ্ন দেখার চেয়ে বেঁচে থাকাটা জরুরি হয়ে পড়ে। আর ভয়টাই বড় হয়ে দেখা দেয়।
সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি স্বপ্ন বয়স দেখে ছোট হয় না। স্বপ্ন ছোট হয় যখন আমরা নিজেকে ছোট ভাবি বলে। কিন্তু একটা পর্যায়ে নিজেকে ছোট ভাবতে বাধ্য হতে হয় আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গীর জন্যও। যেখানে বয়স এনে দেয় অভিজ্ঞতা, পরিপক্বতা, ধৈর্য ও বোঝার ক্ষমতা। কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নানাভাবে মনে করিয়ে দেয় “এই বয়সে আর কী হবে?” তাইতো চাকরির বাজারে বয়সের সীমারেখা টেনে দিয়ে অকর্মণ্য প্রমাণের চেষ্টা চলে। নিজেদের বয়স যতই হোক, নিয়োগকর্তারা যে কোন নিয়োগে ভুলে যান বয়স কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র। সেজন্যই অর্জিত প্রজ্ঞার সাথে শক্তি, সামর্থ্য, সময় ও প্রবল ইচ্ছে নিয়ে কিছু করতে চাইলেও তারা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ মানুষদেরকে থামিয়ে রাখতে অনেকটা বাধ্য করেন।
একদিকে যুব বয়স উত্তীর্ণ হয়ে মধ্যবয়সে এসে এমন বিড়ম্বনা, আবার ঠিক বৃদ্ধ বয়সও নয় কিন্তু বয়স্কদের দলে ভিড়িয়ে কর্মস্পৃহাকে দমনের এমন অমানবিক নিষ্ঠুরতার ফলে বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলো ক্রমশঃ ধুসর হতে শুরু করে। হয়তো এ কারণেই হৃদরোগ, ব্রেইন স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এর মতো জীবননাশকারী রোগগুলো এ সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। একইসাথে নানা রকমের মানসিক সংকটে নিজেকে পরাজিত সৈনিক মনে হতে শুরু করে। তবে কি জীবন এভাবেই থেমে যাবে?
মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
সমাজ বিশ্লেষক ও গবেষক।