খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
দেশের ব্যাংকিং খাতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস (Incentive Bonus) প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নীতিমালায় কিছুটা শিথিলতা এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে কোনো ব্যাংক বছরের নির্ধারিত সকল শর্ত পূরণ করতে না পারলেও, বিশেষ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের কর্মীদের বোনাস প্রদান করতে পারবে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারিকৃত এই নির্দেশনাটি দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক যদি একটি নির্দিষ্ট বছরে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জন করতে সক্ষম না-ও হয়, তবুও সেই বছরে ব্যাংকের যদি বিশেষ কোনো সাফল্য বা উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকে, তবে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে কর্মীদের বোনাস দেওয়া যাবে। এই বিশেষ বোনাসের পরিমাণ হবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সর্বোচ্চ এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ।
পূর্বে উৎসাহ বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর এবং সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী অনুসরণ করতে হতো। বর্তমানে এই নতুন সংযোজনটি মূলত ব্যাংক কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বিশেষ কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ যেমন বাড়বে, তেমনি আর্থিক খাতে এক ধরণের গতিশীলতা তৈরি হবে।
উৎসাহ বোনাস প্রদানের নীতিমালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছুটা শিথিলতা আনলেও, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে বেশ কিছু কঠিন শর্ত বহাল রেখেছে। বিশেষ অর্জনের ভিত্তিতে বোনাস প্রদান করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অবশ্যই নিচের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:
পরিচালন মুনাফা অর্জন: বোনাস প্রদানকারী ব্যাংককে সংশ্লিষ্ট বছরে অবশ্যই পরিচালন মুনাফা (Operating Profit) করতে হবে। লোকসানি কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই সুযোগ প্রযোজ্য হবে না।
মূলধনের স্থিতিশীলতা: ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি আগের বছরের তুলনায় কোনোভাবেই কমে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ, ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখা বোনাস অনুমোদনের অন্যতম পূর্বশর্ত।
সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ: নতুন করে কোনো সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে বিলম্ব করার সুবিধা (Provision Deferral) চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করা যাবে না। ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার সক্ষমতা থাকতে হবে।
পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন: সংশ্লিষ্ট বছরের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে এই বোনাস প্রদানের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই নির্দেশনাটি জারি করেছে মূলত ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)’-এর ৪৫ ধারার অধীনে। এই ধারাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জনস্বার্থে অথবা ব্যাংকিং নীতির স্বার্থে যেকোনো ব্যাংকিং কোম্পানির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করে।
উল্লিখিত নতুন শর্তগুলো ছাড়াও বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে আগের সার্কুলারগুলোতে বর্ণিত অন্যান্য সকল শর্ত ও বিধিনিষেধ অপরিবর্তিত থাকবে। এর আগে ২০২২ ও ২০২৪ সালে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বোনাস এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ব্যবস্থাপনা এবং ব্যয় সংকোচন। বর্তমান নির্দেশনাটি সেই কঠোর অবস্থানের মধ্যে কিছুটা নমনীয়তা নিয়ে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনার ফলে ব্যাংক খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল ব্যাংকগুলো তাদের কর্মীদের বিশেষ অর্জনের জন্য পুরস্কৃত করতে পারবে, যা মেধাবী কর্মকর্তাদের ধরে রাখতে সাহায্য করবে। তবে দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য এই শর্ত পূরণ করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রভিশন ডেফারাল সুবিধার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটি নিশ্চিত করেছে যে, কোনো ব্যাংক যেন গ্রাহকের আমানত ঝুঁকির মুখে ফেলে বা ঋণের ঝুঁকি না লুকিয়ে কৃত্রিম মুনাফা দেখিয়ে বোনাস না দেয়। ফলে একদিকে যেমন কর্মকর্তাদের কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়বে, অন্যদিকে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করার প্রবণতা কমবে। এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
পরিশেষে, এই নির্দেশনাটি মঙ্গলবার থেকেই কার্যকর হওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন থেকে তাদের বার্ষিক হিসাব এবং সাফল্যের মূল্যায়ন সাপেক্ষে নতুন নিয়মে উৎসাহ বোনাস বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। এটি মূলত ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্ব এবং কৃতিত্ব-ভিত্তিক কাজের সংস্কৃতিকে আরও সুদৃঢ় করবে।