খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
হংকংয়ের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক ‘ভিক্টোরিয়া পিক’ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নজিরবিহীন প্রাকৃতিক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। বিমা খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এইচডিআই গ্লোবাল (HDI Global)-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এইচডিআই রিস্ক কনসাল্টিং সম্প্রতি তাদের ‘আইকনিক ল্যান্ডমার্ক সিরিজ’-এর অংশ হিসেবে একটি বিশদ বিশ্লেষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ভবিষ্যতে চরম আবহাওয়ামূলক পরিস্থিতিতে ভিক্টোরিয়া পিকের বর্তমান সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ব্যর্থ হতে পারে। উপাত্ত-নির্ভর মডেলিংয়ের মাধ্যমে তৈরি এই গবেষণা প্রতিবেদনে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং তীব্র বৃষ্টিপাত কীভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানটির নিরাপত্তা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে, তা তুলে ধরা হয়েছে।
ভিক্টোরিয়া পিক প্রতি বছর প্রায় ৭০ লক্ষ দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করে। তবে এইচডিআই-এর প্রতিবেদনে এই অঞ্চলের উত্তর ঢালের ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঢালগুলো মূলত আবহাওয়াগ্রস্ত গ্রানাইট (Weathered Granite) শিলা দ্বারা গঠিত। যখন অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে এই শিলাস্তরগুলো পানিপূর্ণ বা সম্পৃক্ত হয়ে যায়, তখন তা চরমভাবে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
হংকংয়ে সম্প্রতি রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিপাতের ঘটনাগুলো এই উদ্বেগকে আরও ঘনীভূত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক ঘণ্টায় ১৫৮.১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১৯৭০-এর দশক থেকে হংকং সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় ভূমিধসের ঝুঁকি ৭৫ শতাংশের বেশি কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা এখন এতটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সেই চরম পরিস্থিতি মোকাবিলায় অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হতে পারে।
প্রতিবেদনে কেবল বৃষ্টিপাত নয়, বরং ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ বা ‘হিট স্ট্রেস’ সম্পর্কেও উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে (Business as usual scenario), ২১০০ সাল নাগাদ ভিক্টোরিয়া পিকের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১.২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
এই চরম তাপমাত্রার প্রভাব হবে বহুমুখী:
বাস্তুসংস্থানিক ক্ষতি: অতিরিক্ত তাপে উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলের গাছপালার পাতা সময়ের আগেই ঝরে পড়বে।
দাবানলের ঝুঁকি: ঝরে পড়া এই শুষ্ক পাতাগুলো শুষ্ক মৌসুমে জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে, যা ভয়াবহ দাবানলের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
পর্যটন ও জনস্বাস্থ্য: তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে দর্শনার্থীদের আচরণের পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রখর রোদে খাড়া পাহাড়ি পথগুলোতে ভ্রমণের সময় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে, ফলে পর্যটকরা কেবল শীতল সকাল বা সন্ধ্যার সময়ের ওপর নির্ভর করতে পারেন।
এইচডিআই গ্লোবাল হংকং-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) মাইকেল আন এই প্রতিবেদনের গুরুত্ব তুলে ধরে জানান যে, সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো আগেভাগে শনাক্ত করতে পারলে কোনো বড় বিপর্যয় ঘটার আগেই শহরের সহনশীলতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই গবেষণা মূলত নীতিনির্ধারক ও নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে, যাতে তারা ভিক্টোরিয়া পিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় নতুন কৌশল গ্রহণ করতে পারেন।
বিমা খাতের বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ঝুঁকিগুলো কেবল পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক এবং কাঠামোগত সুরক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। হংকংয়ের বর্তমান ঢাল সুরক্ষা ব্যবস্থা (Slope Protection) বৈশ্বিকভাবে সমাদৃত হলেও, চরম আবহাওয়ার নব্য প্রেক্ষাপটে একে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা এখন অনস্বীকার্য।
ভিক্টোরিয়া পিকের নিরাপত্তা বজায় রাখা হংকংয়ের পর্যটন এবং ঐতিহ্যের জন্য অপরিহার্য। এইচডিআই রিস্ক কনসাল্টিং-এর এই বিশদ বিশ্লেষণটি স্পষ্ট করে দেয় যে, অতীতের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা নিরাপত্তা সীমানাগুলো এখন আর যথেষ্ট নয়। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তাপমাত্রা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ধরনগুলো মোকাবিলায় প্রকৌশলগত উদ্ভাবন এবং পরিবেশগত সংরক্ষণের একটি সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। অন্যথায়, হংকংয়ের এই আইকনিক ল্যান্ডমার্কটি চরম আবহাওয়ার কাছে অরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে, যা পর্যটন শিল্প ও জননিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী সংকটের কারণ হবে।