খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
দক্ষিণ লেবাননের কান্তারা গ্রামে ইরান-পন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর একটি বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন হামলায় দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর এক সেনা নিহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সকালে সংঘটিত এই ঘটনায় আরও এক ইসরায়েলি সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। বর্তমান অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই হামলাটি ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধের তীব্রতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, নিহত সেনার নাম সার্জেন্ট লিয়েম বেন হামো। ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ সেনা ইসরায়েলি বাহিনীর অত্যন্ত প্রশিক্ষিত গোলানি ব্রিগেডের ১৩ নম্বর ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন।
আইডিএফ-এর প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে হিজবুল্লাহ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্তারা গ্রাম লক্ষ্য করে দুটি কামিকাজে বা বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নিক্ষেপ করে। ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৎপর হয়ে একটি ড্রোনকে মাঝ আকাশেই ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়। তবে দ্বিতীয় ড্রোনটি শনাক্তকরণ এড়িয়ে গোলানি ব্রিগেডের সেনাদের অবস্থানের সন্নিকটে আছড়ে পড়ে এবং সজোরে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই লিয়েম বেন হামো নিহত হন এবং তার পাশে থাকা অন্য এক সেনাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে সামরিক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে এই হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, কান্তারা গ্রামে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের দুটি মারকাভা ট্যাংককে লক্ষ্য করে এই ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। গোষ্ঠীটির দাবি, ইসরায়েলি সেনারা যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করছে এবং এটি তারই একটি প্রতিরোধমূলক জবাব। মূলত দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরক ড্রোন ব্যবহার করে ইসরায়েলি সাঁজোয়া বহর এবং পদাতিক সেনাদের টার্গেট করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
এই সংঘাতের শিকড় মূলত ২০২৬ সালের গোড়ার দিকে প্রোথিত। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানের পর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের মিত্র হিসেবে হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। হিজবুল্লাহর অভিযোগ, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের অনেক এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনারা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি এবং তারা নিয়মিতভাবে লেবাননের আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহ সীমান্ত এলাকায় তাদের সামরিক পরিকাঠামো পুনরায় তৈরি করছে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মাঝেই নিয়মিত বিরতিতে ড্রোন ও রকেট হামলা এবং সীমান্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার লেবাননের অভ্যন্তরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পুনরায় একটি পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযান শুরু করার পরিকল্পনা করলেও এতে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন পাওয়া যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে বা বড় কোনো সামরিক অভিযানের সবুজ সংকেত দিতে অসম্মতি জানিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থানের কারণে ইসরায়েলি বাহিনী মূলত আকাশপথে হামলা এবং হিজবুল্লাহর ড্রোন আক্রমণের মোকাবিলা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবারের এই প্রাণহানি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে জনমতকে আবারও যুদ্ধের পক্ষে উসকে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ড্রোন হামলার ঘটনার পরপরই কান্তারা গ্রাম এবং এর আশপাশের হিজবুল্লাহর সম্ভাব্য অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ও আর্টিলারি ইউনিট ব্যাপক গোলাবর্ষণ ও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। আইডিএফ জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং পর্যবেক্ষণ চৌকিগুলো ধ্বংস করতে তারা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আক্রমণ পরিচালনা করছে।
টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্জেন্ট লিয়েম বেন হামোর মৃত্যুর পর ইসরায়েলি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গোলানি ব্রিগেডের অবস্থানগুলো আরও সুরক্ষিত করতে এবং ভবিষ্যতে ড্রোন আক্রমণ প্রতিহত করতে নতুন প্রযুক্তির জ্যামার মোতায়েন করা হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ এই ধরনের ছোট ছোট সংঘর্ষ যেকোনো সময় একটি অনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।