খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মৃত্যু ও তার দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছেন। ফ্লোরিডার টাম্পা বে সংলগ্ন সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি দুর্গম এলাকা থেকে তার খণ্ডিত দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। এর আগে একই এলাকা থেকে অপর এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ।
নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল লিমন—উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১৬ এপ্রিল থেকে তারা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। নিখোঁজের পরপরই তাদের সন্ধান চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দ্রুত তল্লাশি অভিযান শুরু করে। নিখোঁজ হওয়ার আট দিন পর, অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল, টাম্পা বে এলাকার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের নিচ থেকে প্রথমে জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পর বৃষ্টির সন্ধান পেতে অভিযান আরও জোরদার করা হয়।
নিখোঁজ হওয়ার দশম দিন অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির দেহাবশেষের সন্ধান মেলে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধার প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ আকস্মিক। সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি ম্যানগ্রোভ বনের নিকটবর্তী জলাশয়ে দুইজন ব্যক্তি মাছ ধরছিলেন। মাছ ধরা চলাকালীন তারা পানিতে ভাসমান একটি বড় ব্যাগ বা পোটলা আটকে থাকতে দেখেন।
ব্যাগটির কাছাকাছি যাওয়ার পর সেখান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকলে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সন্দেহবশত তারা ব্যাগটি পর্যবেক্ষণ করেন এবং এর ভেতরে মানবদেহের খণ্ডিত অংশ দেখতে পান। প্রত্যক্ষদর্শীরা তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় জরুরি সেবা ও পুলিশকে সংবাদ দিলে গোয়েন্দা সংস্থা এবং ফরেনসিক দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। সেন্ট পিটার্সবার্গের ওই জলাশয়টি জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না।
উদ্ধারকৃত দেহাবশেষগুলো পচে যাওয়ায় এবং খণ্ডিত হওয়ায় প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে তিনটি বৈজ্ঞানিক ও বস্তুগত প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে এটি নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির দেহাবশেষ:
ডিএনএ বিশ্লেষণ (DNA Analysis): উদ্ধার হওয়া দেহাংশ থেকে সংগৃহীত ডিএনএ নমুনার সাথে নিখোঁজ বৃষ্টির ডিএনএ প্রোফাইলের মিল পাওয়া যায়। এটি ছিল শনাক্তকরণের প্রধান ভিত্তি।
দন্ত্য ফরেনসিক (Dental Records): বৃষ্টির পূর্বের দাঁতের চিকিৎসার (Dental Work) তথ্যাদি এবং এক্স-রে রেকর্ডের সাথে উদ্ধারকৃত দেহাবশেষের দাঁতের গঠন হুবহু মিলে যায়।
পোশাক ও ব্যক্তিগত নিদর্শন: নিখোঁজ হওয়ার দিন বৃষ্টি যে বিশেষ ধরনের পোশাক পরেছিলেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহের সাথে থাকা পোশাকের অবশিষ্টাংশ সেটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে পুলিশ জামিল লিমনের সাবেক রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং পরবর্তীতে তাকে গ্রেপ্তার করে। তদন্তকারীরা হিশামের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা যায়, হিশামের বাসায় পাওয়া রক্তের ডিএনএ-র সঙ্গে বৃষ্টির ডিএনএ নমুনার শতভাগ মিল রয়েছে। এই অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, হত্যাকাণ্ডটি হিশামের বাসাতেই সংঘটিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে দেহাবশেষ জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
ফ্লোরিডা পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বৃষ্টির পরিবারকে এই হৃদয়বিদারক সংবাদটি অবহিত করেছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ তাদের দুই শিক্ষার্থীর এমন অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাদের স্মরণে একটি শোকসভার আয়োজন করা হয় এবং তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে বিশেষ বৃত্তি বা স্মারক উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকেও এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত হিশাম আবুগারবিয়েহ পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।