খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
বাঙালি জাতির অশেষ ঋণের আলোকবর্তিকা, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রধান কণ্ঠস্বর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মজয়ন্তীর এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপ্রতিম পুরুষকে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করবে সমগ্র দেশবাসী। পরাধীনতার অন্ধকার সময়ে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে কবি আজও বাঙালিকে আলোর পথ দেখিয়ে চলেছেন। বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে আজ সারা দেশে জাতীয় কবির জন্মদিন উদযাপিত হচ্ছে।
কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক অতি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল স্থানীয় মক্তবে। কিন্তু পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পর চরম দারিদ্র্যের কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। মাত্র ১০ বছর বয়সেই পরিবারের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কবি জীবিকার প্রয়োজনে লেটো দলে যোগ দেন, মসজিদের মুয়াজ্জিন ও মাজারের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং একপর্যায়ে রুটির দোকানেও কাজ নেন। তরুণ বয়সে তিনি সেনা সদস্য হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তী জীবনে তিনি সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
নিচে জাতীয় কবির জীবন পরিক্রমা ও বিভিন্ন পেশাগত ভূমিকার সংক্ষিপ্ত বিবরণী ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| জীবনের পর্যায় ও ক্ষেত্র | অতিক্রান্ত স্থান ও প্রতিষ্ঠান | পালিত ভূমিকা ও কর্মতৎপরতা |
| শৈশব ও কৈশোর | চুরুলিয়া গ্রাম, আসানসোল | মক্তবের শিক্ষার্থী, মাজারের খাদেম, রুটির দোকানের কর্মী |
| বাল্যকাল | লেটো দল | সাহিত্য চর্চার সূচনা ও নাট্যদলের সদস্য |
| তরুণ বয়স | সেনাবাহিনী | যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ও সেনা সদস্য |
| কর্মজীবন | সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক দল | সাংবাদিকতা, সম্পাদনা ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা |
বাল্যকালেই লেটো দলে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে নজরুলের সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। তাঁর রচিত কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্যকে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করেছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে তিনি তৎকালীন সমাজে বিশেষ আলোড়ন তোলেন এবং শোষকদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান সুষ্পষ্ট করেন। কাছাকাছি সময়ে রচিত তাঁর আরেকটি বিখ্যাত কবিতা ‘কামাল পাশা’, যাতে ভারতীয় মুসলিমদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতা এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। নজরুলের সৃষ্টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ জুড়ে রয়েছে সংগীত। তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান রচনা করেছেন, যা বাংলা সংগীতের সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার। সুরবৈচিত্র্যে ভরপুর এই গানগুলো এবং তাঁর সৃষ্ট নতুন রাগগুলো বাংলা সংগীতকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সাম্য, মানবতা ও প্রেমের বাণী প্রচার করেছেন। তিনি সমাজের নিচু শ্রেণির মানুষকে বুকে টেনে নিয়েছেন এবং নারীর প্রতি সামাজিক উপেক্ষা ও অবহেলার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। ধার্মিক মুসলিম সমাজ ও অবহেলিত জনগণের সঙ্গে সুগভীর সম্পর্ক থাকলেও তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার ছিলেন এবং স্বার্থান্ধ মৌলবাদীদের তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছেন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এই কবি তৎকালীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারণে অসংখ্যবার কারাবরণ করেন। কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থাতেই তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ রচনা করেন।
নিচে কবির উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিসমূহ ও সমাজভাবনার বিবরণ ছকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হলো:
| সৃষ্টির ক্ষেত্র ও শ্রেণী | উল্লেখযোগ্য নাম বা সংখ্যা | মূল উপজীব্য বিষয় ও সামাজিক চেতনা |
| বিখ্যাত কবিতাসমূহ | বিদ্রোহী, কামাল পাশা | শোষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনা |
| সংগীত ভাণ্ডার | প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান | সুরবৈচিত্র্য এবং নতুন রাগের সৃষ্টি |
| কারাগারের রচনা | রাজবন্দীর জবানবন্দী | সাম্রাজ্যবাদ ও ব্রিটিশ শাসনবিরোধী চেতনা |
| সামাজিক আদর্শ | সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতা | মানবতাবোধ, নারীর অধিকার রক্ষা ও মৌলবাদের নিন্দা |
কবির জীবনজুড়ে ছিল নানা লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালে তিনি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এই অবস্থায় দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পর, ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে ভারত থেকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করেন। কবির জীবনের শেষ দিনগুলো তৎকালীন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অতিবাহিত হয়। দীর্ঘ রোগ ভোগের পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট এই হাসপাতালেই তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। কবির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।