খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩১ মে ২০২৬
নেপালের বর্তমান কার্যনির্বাহী প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী একজন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি বহুল আলোচিত বিষয়। তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয় রাজনৈতিক ভাবধারার সংগীত হলো ‘ম নেপালও হাসেকো হের্ন চাহাচ্ছু’, যার বাংলা অর্থ ‘আমি দেখতে চাই নেপাল হেসে উঠুক’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের দেখা এই সংগীতটি কাঠমান্ডুর পৌরপ্রধান বা মেয়র নির্বাচনের সময় বালেন শাহর জনপ্রিয়তার ভিত তৈরি করেছিল। বর্তমানে তিনি দেশটির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ তথা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
নেপালের নতুন প্রজন্ম বা জেন-জিরা দেশটিতে একটি সফল গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত করার পর এই তরুণ নেতাকে সামনে রেখে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং একটি নতুন সরকার গঠন করে। তবে এই তরুণ সরকারের পথচলার মাত্র দুই মাস পূর্ণ হতেই র্যাপার প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে নাগরিক সমাজের উচ্চাশা ও প্রত্যাশায় বড় ধরণের ভাটা পড়েছে। সাধারণ জনগণের প্রাত্যহিক আড্ডার আলোচনার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের মূলধারার সংবাদপত্রগুলো এখন সরকারের নানামুখী সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে সম্পাদকীয় প্রকাশ করতে শুরু করেছে। একই সাথে সরকারের জারি করা বেশ কিছু জরুরি ডিক্রি বা আদেশ দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান সম্মত নয় বলে দেশটির উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট একের পর এক স্থগিতাদেশ প্রদান করছেন। খোদ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরেও প্রধানমন্ত্রীর শাসনপদ্ধতি ও আচরণ নিয়ে অস্বস্তি দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
নেপালের এই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের প্রায় এক বছর পরে অনুষ্ঠিত হলেও দুই দেশের নতুন শাসনব্যবস্থার যাত্রাকালীন সময়টি প্রায় কাছাকাছি। যেকোনো নতুন রাজনৈতিক সরকারের সামগ্রিক মূল্যায়নের জন্য দুই মাস সময় অত্যন্ত অপর্যাপ্ত হলেও নেপালের প্রধান প্রধান প্রচারমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহর তীব্র জবাবদিহি দাবি করতে শুরু করেছে। দেশটির প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এ গত সাত-আট সপ্তাহে তাঁকে নিয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় অন্তত পাঁচটি সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
৩৬ বছর বয়সী এই তরুণ প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ের একদম পাশেই অবস্থিত পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদে অত্যন্ত কম উপস্থিত হন এবং সেখানে বক্তব্য দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন। নেপালের সংসদীয় ইতিহাসে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম সাত সপ্তাহে কোনো প্রধানমন্ত্রীর সংসদে একটিও নীতি নির্ধারণী বক্তব্য না দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। গত ২রা এপ্রিল দেশটির সংসদের যৌথ অধিবেশনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের মাঝপথে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক কক্ষ ত্যাগ করার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদের কোনো প্রশ্নোত্তর পর্বেও সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না; বরং তাঁর কাছে উত্থাপিত জাতীয় প্রশ্নসমূহের উত্তর প্রদানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তিনি দেশের অর্থমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত করেছেন। এই ধরণের বিচিত্র পদক্ষেপের কারণে নেপালের ঐতিহ্যগত সংসদীয় শাসনব্যবস্থা এক প্রকার রাষ্ট্রপতিশাসিত বা একনায়কতান্ত্রিক পদ্ধতির দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অভিমত প্রকাশ করছেন।
গত দুই মাসে প্রধানমন্ত্রীর গৃহীত প্রতিটি নীতি ও সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নিজের ব্যক্তিগত প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি দেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে প্রচলিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন থেকে কেটে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সাথে সংযুক্ত করেছেন। এর বাইরেও, কাঠমান্ডুসহ নেপালের প্রধান প্রধান শিল্প শহরগুলোতে নিম্নআয়ের ভাসমান মানুষের অস্থায়ী বাসস্থান বা বস্তিগুলো সরকারি বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ করার কারণে দেশজুড়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে।
পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে দরিদ্র ও ভূমিহীনদের এই আকস্মিক উচ্ছেদকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো চরম অমানবিক ও বৈষম্যমূলক বলে আখ্যায়িত করেছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফামের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী নেপালের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের চিত্রটি নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| নেপালের জনসংখ্যার সামাজিক বিন্যাস | জাতীয় সম্পদে মালিকানার শতকরা হার |
| অর্থনৈতিকভাবে উচ্চস্তরের শীর্ষ ১ শতাংশ জনগোষ্ঠী | ২৫ শতাংশ সম্পদ |
| অর্থনৈতিকভাবে নিম্নস্তরের ৫০ শতাংশ ভূমিহীন জনগোষ্ঠী | ৫ শতাংশের কম সম্পদ |
এই তীব্র বৈষম্যের বাজারে সরকারের এমন উচ্ছেদ নীতির বিরুদ্ধে ভূমিহীনদের অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত স্থানীয় সংগঠনগুলো প্রতিদিন দেশের বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। যদিও সরকারের দাবি, তারা এই উচ্ছেদকৃত মানুষদের পরবর্তীতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বর্তমান জেন-জি সরকার সবচেয়ে বড় আইনি ও সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়েছে দেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগকে কেন্দ্র করে। জ্যেষ্ঠতার চিরাচরিত নিয়ম সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে তিনজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও প্রবীণ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহর নেতৃত্বাধীন সংবিধান পরিষদ মনোজ কুমার শর্মাকে দেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছে। এই বিতর্কিত নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে ইতিমধ্যে উচ্চ আদালতে একাধিক রিট আবেদন করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিচার বিভাগের অভ্যন্তরে একটি নীতিগত বিভেদ তৈরি হয়েছে, কারণ নতুন প্রধান বিচারপতির চেয়েও সিনিয়র তিনজন বিচারপতি এখনও সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত আছেন। যদি এই সিনিয়র বিচারপতিদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, তবে এই আইনি বিতর্ক আরও চরম রূপ নিতে পারে।
সরকারের বিভিন্ন সামাজিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং উচ্চ আদালতের আদেশের একটি তুলনামূলক বিবরণ নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো:
| সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও নীতিসমূহ | উচ্চ আদালতের আইনি আদেশ ও বর্তমান আইনি স্থিতি |
| সরকারি কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন নিষিদ্ধকরণ | উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিত; এই অধিকার সিভিল সার্ভিস আইন ও আইএলওর নীতিসম্মত। |
| শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার বন্ধ | উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিত; দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। |
| সীমান্তপথে আসা নিত্যপণ্যের ওপর ৫% থেকে ৮০% শুল্ক আরোপ | উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিত; নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় সীমান্তবর্তী মানুষের ওপর চাপ তৈরি করেছিল। |
বিশেষ করে ভারত-নেপাল সীমান্তের ঐতিহাসিক উন্মুক্ত প্রকৃতির কারণে নেপালের একটি বিশাল অংশের মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটার জন্য পার্শ্ববর্তী ভারতীয় বাজারের ওপর বহু বছর ধরে নির্ভরশীল। সরকারের এই নতুন সীমান্ত শুল্ক নীতির কারণে সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটেছে এবং তারা সরকারের ওপর মারাত্মক ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব ধাঁচের শাসনপদ্ধতি এবং ব্যক্তিগত চালচলন নিয়ে তাঁর দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি)-এর অভ্যন্তরেও চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ২০২২ সালে তরুণ পেশাজীবীদের হাত ধরে গঠিত এই রাজনৈতিক দলটি ৫ই মার্চের সাধারণ নির্বাচনের ঠিক পূর্বে বালেন শাহকে নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। তবে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী দলের কোনো নীতি নির্ধারণী বৈঠকে অংশ নেন না এবং দলীয় নেতাদের সাথেও কোনো প্রকার যোগাযোগ রক্ষা করছেন না।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও এক ধরণের জটিলতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের পূর্বে আরএসপি নেপালকে কোনো দেশের ‘বাফার রাষ্ট্র’ না বানিয়ে সব দেশের ‘সংযোগকারী রাষ্ট্র’ করার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে গত ২৭শে মার্চ সরকার গঠনের পর থেকে ভারত বা চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা দেশটিতে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেপাল সফর করেছেন, যেখানে ওয়াশিংটনের মূল আগ্রহের বিষয় ছিল তিব্বতি শরণার্থী। এই বিষয়টি প্রতিবেশী দেশ চীনের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেন-জি আন্দোলনের সময় অনেক বিক্ষোভকারীকে ‘টিওবি’ বা ‘দ্য অরিজিনাল ব্লাড’ লেখা পোশাক পরিধান করতে দেখা গেছে, যারা তিব্বত মুক্ত করার আন্দোলনের সাথে যুক্ত বলে বেইজিং মনে করে।
অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির কাঠমান্ডু সফর আকস্মিকভাবে বাতিল হওয়া নয়া দিল্লিকে বিব্রত করেছে। নেপালের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ পদমর্যাদায় তাঁর চেয়ে নিচের কোনো বিদেশি কর্মকর্তার সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসতে রাজি নন। দুই বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীনের সাথে সীমান্ত বিরোধের কারণে নেপালে এক প্রকার কঠোর জাতীয়তাবাদী মনোভাব বিরাজ করছে। বিশেষ করে ‘লিপুলেখ’ নামক বিতর্কিত এলাকা দিয়ে ভারত ও চীন যৌথভাবে বাণিজ্য পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কাঠমান্ডুর রাজনৈতিক মহলে অবহেলার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই প্রতিবেশীকে এড়িয়ে নেপালের বর্তমান সরকার কতটা সফল কূটনীতি পরিচালনা করতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।