খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন ২০২৬
তিন মাস ধরে চলমান মধ্যপ্রাচ্য তথা ইরান সংকটের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের সামগ্রিক জ্বালানি খাত চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি এড়াতে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো নিজস্ব কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা তেলের মজুত গড়ে তোলার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সোমবার (১ জুন) জাপানভিত্তিক অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই কৌশলগত পদক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পেট্রোলিয়াম বিভাগ সম্প্রতি দেশটিতে তেলের এই কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে একটি সমীক্ষা পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক দরপত্র আহ্বান করেছে। পাকিস্তানের সরকারি নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হওয়া তীব্র অনিশ্চয়তা দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কঠোরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে।
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানিকৃত খনিজ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বিশাল অংশ আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’র মাধ্যমে দেশটির বন্দরে এসে পৌঁছায়। তবে দীর্ঘদিনের এই আমদানিনির্ভরতা সত্ত্বেও জরুরি পরিস্থিতিতে বা যুদ্ধকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্য পাকিস্তানের নিজস্ব কোনো কৌশলগত তেল মজুত বা পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ নেই।
এই চরম খামতি দূর করার লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার এখন রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণাগার, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক মজুত এবং বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত বন্ডেড স্টোরেজ সুবিধাকে একত্রিত ও সমন্বিত করে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
পাকিস্তানের সরকারি সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশটির সরকার সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং বৈশ্বিক পরাশক্তি চীনের সঙ্গে পাকিস্তানে অত্যাধুনিক বন্ডেড তেল টার্মিনাল স্থাপনের বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য স্থান হিসেবে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর ‘গওয়াদর বন্দর’-এর নাম বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরে কোনো ভূ-রাজনৈতিক বা সামরিক জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এই সকল বিশেষায়িত স্থাপনায় সংরক্ষিত জ্বালানি দেশের অভ্যন্তরীণ জরুরি চাহিদা মেটাতে সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
পাকিস্তানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত পরিকল্পনার প্রাথমিক বা প্রথম ধাপে দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৪৫ দিনের সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদা মেটানোর মতো সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই ধারণক্ষমতা বা সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করে ৯০ দিনের সমপরিমাণ জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) বৈশ্বিক সুপারিশ ও গাইডলাইন অনুযায়ী, যেকোনো আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখতে কমপক্ষে ৯০ দিনের সমপরিমাণ তেল বা জ্বালানি মজুত রাখা আবশ্যক। পাকিস্তানও সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনের লক্ষ্যে তাদের এই নতুন প্রকল্প সাজিয়েছে।
পাকিস্তানের জ্বালানি খাতের শীর্ষস্থানীয় বিশ্লেষকেরা অবশ্য এই পরিকল্পনার বিষয়ে কিছু জরুরি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, বন্ডেড সংরক্ষণব্যবস্থা বা স্টোরেজ সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে জরুরি অবস্থায় মজুতকৃত তেল ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা, সংকটকালীন সময়ে তেলের মূল্য নির্ধারণের সঠিক পদ্ধতি, মজুতসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছ প্রকাশ এবং সরবরাহ অগ্রাধিকারের বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট আইনি নির্দেশনা থাকতে হবে। অন্যথায়, এই বৃহৎ উদ্যোগটি প্রকৃত কৌশলগত মজুতের রূপ নেওয়ার পরিবর্তে সাধারণ একটি বাণিজ্যিক গুদাম বা বাণিজ্যিক টার্মিনাল হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
এই বিশাল ও ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থায়নের জন্য পাকিস্তান সরকার দেশের বিদ্যমান পেট্রোলিয়াম লেভি থেকে প্রতি লিটার জ্বালানিতে ১০ পাকিস্তানি রুপি করে কেটে নিয়ে একটি বিশেষ জাতীয় তহবিল গঠনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে মাত্র এক মাসের প্রয়োজনীয় তেল মজুত গড়ে তুলতেই পাকিস্তানের প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বা ১ বিলিয়ন ডলারের মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় যদি দেশের বেসরকারি খাতকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়, তাহলে সরকারের ওপর সরাসরি আর্থিক ও বাজেটের চাপ অনেকটাই হ্রাস পাবে।
অন্যদিকে, দেশটির কয়েকজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞের অভিমত, বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে সরকারের শুধু তেলের মজুত বাড়ানোর দিকে একক মনোযোগ দেওয়া উচিত হবে না। এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিক পরিবহন ব্যবস্থার (ইভি) সামগ্রিক উন্নয়নের ওপরও সমানভাবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।