দীর্ঘ ১৩ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে নিজ বাসভবনে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে তার বাসভবন ‘চুনকা কুটির’-এর সামনে কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি এবং এলাকাজুড়ে পুলিশের বাড়তি নজরদারি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত চুনকা কুটির এলাকায় দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষজন সাবেক এই মেয়রকে শুভেচ্ছা জানাতে ভিড় করছেন। যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে দর্শনার্থীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে, তারপরও জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং আশপাশের এলাকা থেকে অনেকে তাকে দেখতে আসছেন।
বুধবার রাত সোয়া ১০টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান আইভী। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি নিজ বাসভবনে পৌঁছান। তার মুক্তির পরপরই চুনকা কুটিরের সামনে এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং পুরো সদর এলাকাকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনসমাগমস্থলে ধাপে ধাপে প্রায় দুই হাজার আধুনিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইভীর বাসভবনকে ঘিরে যাতে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় এবং জননিরাপত্তা বজায় থাকে, সে বিষয়েও বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে।
পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে অবস্থানকালে আইভী নিয়মিত ধর্মীয় অনুশীলন, প্রার্থনা এবং আত্মসমালোচনায় সময় ব্যয় করেছেন। বন্দিজীবনকে তিনি আত্মশুদ্ধি ও মানসিক দৃঢ়তা অর্জনের একটি বিশেষ সময় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফলে মুক্তির পর প্রথম দিনেই রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্য কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। বরং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, তাদের শুভেচ্ছা গ্রহণ এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতেই তিনি অধিক মনোযোগ দিয়েছেন।
তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোদ্ধারাও জানিয়েছেন, দীর্ঘ বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা তাকে নতুনভাবে ভাবতে সহায়তা করেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিবর্তে আপাতত তিনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সময়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
আইভীর কারাবন্দি ও মুক্তি-সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত তথ্য
বিষয়
তথ্য
গ্রেপ্তারের তারিখ
৯ মে ২০২৫
গ্রেপ্তারের স্থান
নারায়ণগঞ্জের বাসভবন
কারাভোগের সময়
প্রায় ১৩ মাস
মুক্তির তারিখ
৩ জুন ২০২৬ রাত
কারাগার
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার
মুক্তির ধরন
আদালতের জামিন
সংশ্লিষ্ট মামলা
১২টি
সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতি
দুটি হত্যা মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন
সেলিনা হায়াৎ আইভী দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম পরিচিত মুখ। তিনি ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর টানা তিনবার নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধিত্বের বিরল নজির স্থাপন করেন। নগর উন্নয়ন, নাগরিক সেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয় অবস্থানের কারণে তিনি জাতীয় পর্যায়েও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
তার মুক্তিকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে নতুন রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও তিনি এখনো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি, তবুও তার বাসভবনে শুভাকাঙ্ক্ষীদের ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং প্রশাসনের বিশেষ নজরদারি প্রমাণ করছে যে, স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রভাব ও গুরুত্ব এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বিদ্যমান।