খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বাংলাদেশের সামগ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্প পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে গিয়ে আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির এই চিত্র আরও বিস্তৃত ও প্রকট হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রাপ্ত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এই ঘাটতির পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে জানা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান অর্থবছরের এই ১০ মাসের ঘাটতি হিসাবের মধ্যে কেবল মাত্র এপ্রিল মাসেই এককভাবে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক মাসের ব্যবধানে ঘাটতির এই উল্লম্ফন দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অর্থনীতিবিদ এবং এই খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম প্রধান ও মৌলিক কারণ হলো দেশের অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখা এবং নতুন নতুন শিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের অনিবার্য অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তরলীকৃত জ্বালানি, বিভিন্ন খাতের কাঁচামাল এবং ভারী শিল্পের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা এবং সেই তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধির এক ধরণের সীমাবদ্ধতা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও নাজুক করে তুলেছে। রপ্তানি থেকে অর্জিত আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় কয়েক গুণ বেশি হওয়ার ফলেই প্রতি মাসে এই ব্যবধান জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতির এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে প্রথমত, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা সঞ্চয়ের ওপর সরাসরি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমদানির দায় মেটাতে গিয়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রা ‘টাকা’-র বিনিময় হার বা মান ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। তৃতীয়ত, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বা জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করবে।
দেশের এই চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, ঘাটতির এই নেতিবাচক প্রবণতা থেকে মুক্তি পেতে হলে অবিলম্বে দেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে, অর্থাৎ কেবল তৈরি পোশাক খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে। একই সাথে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান ও সম্প্রসারণ করা জরুরি। এছাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর থেকে জ্বালানি আমদানির একক নির্ভরতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস করা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বহুলাংশে বাড়িয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। এই নীতিগত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্য একটি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।