খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তাঁর স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মির বহুল আলোচিত বিয়ে-সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলার আইনি অবসান ঘটেছে। আজ বুধবার (১০ জুন) বেলা ১২টায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিজ্ঞ বিচারক ক্রিকেটার নাসির হোসেন এবং তামিমা সুলতানা তাম্মিকে এই মামলা থেকে সম্পূর্ণ খালাস প্রদানের আদেশ দেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আশুতোষ ভৌমিক রায়ের এই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
আদালতের এই রায়ের পর তীব্র অসন্তোষ ব্যক্ত করেছে বাদীপক্ষ। বাদীপক্ষের নিয়োজিত আইনজীবী ইসরাত হাসান সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁরা এই রায়ে মোটেও সন্তুষ্ট নন এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে এই আদেশের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করবেন। অপরদিকে, আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু (নাসির হোসেনের পক্ষে) এবং অ্যাডভোকেট মোসলেহ উদ্দিন জসীম (তামিমা সুলতানার পক্ষে)। শুনানিতে তাঁরা শুরু থেকেই রাকিব হোসেনের করা এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ অসত্য ও ভিত্তিহীন দাবি করে আসামিদের নির্দোষ হিসেবে খালাস প্রদানের সওয়াল-জবাব করেছিলেন।
মামলার নথিসূত্র ও এজাহারের বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তামিমা সুলতানা তাম্মির সাথে রাকিব হোসেন নামের এক ব্যক্তির প্রথম বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্রিকেটার নাসির হোসেনের সাথে তামিমা সুলতানার বিয়ের বেশ কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। এর পরেই একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তামিমার পূর্বের স্বামী রাকিব হোসেন এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করা হয় যে, প্রথম বৈবাসিক সম্পর্ক দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে সমাপ্ত বা বিচ্ছেদ হওয়ার আগেই তামিমা ক্রিকেটার নাসিরের সাথে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তবে নাসির ও তামিমা শুরু থেকেই এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে আসছিলেন যে, পূর্বের বৈবাহিক সম্পর্ক আইন অনুযায়ী পুরোপুরি শেষ হওয়ার পরেই তাঁরা সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে বিবাহ সম্পন্ন করেছেন।
মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম শেষে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মিজানুর রহমান আদালতে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। উক্ত প্রতিবেদনে নাসির হোসেন, তামিমা সুলতানা তাম্মি এবং তামিমার মা সুমি আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদালত নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন, তবে একই সাথে তামিমার মা সুমি আক্তারকে এই মামলা থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হয়।
নিচে এই আলোচিত মামলার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক ঘটনাবলি একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক সংখ্যা | বিশেষ ঘটনাবলির বিবরণ | সুনির্দিষ্ট তারিখ ও সময়কাল |
| ১ | তামিমা সুলতানা ও রাকিব হোসেনের প্রথম বিবাহ | ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১১ |
| ২ | ঢাকার আদালতে রাকিব হোসেনের মামলা দায়ের | ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ |
| ৩ | আদালতে তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন দাখিল | ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ |
| ৪ | নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন | ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ |
| ৫ | আদালতে মামলার আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু | ২০ মার্চ, ২০২৩ |
| ৬ | মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্তি | ১৬ এপ্রিল, ২০২৫ |
| ৭ | উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন | ৬ মে, ২০২৬ |
| ৮ | আদালতের চূড়ান্ত রায় ও দম্পতির খালাস | ১০ জুন, ২০২৬ (বেলা ১২টা) |
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আসামিপক্ষের দায়ের করা রিভিশন আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর একই বছরের ২০ মার্চ থেকে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত মোট ১০ জন সাক্ষীর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর, চলতি বছরের মার্চ মাসে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং তামিমা সুলতানা নিজের পক্ষে আদালতে সাফাই সাক্ষ্য প্রদান করেন। অবশেষে গত ৬ মে উভয় পক্ষের lawyers বা আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন অর্থাৎ ১০ জুন ধার্য করেছিলেন। দীর্ঘ শুনানি ও তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আজ আদালত এই দম্পতিকে খালাস দেওয়ার মাধ্যমে মামলার পরিসমাপ্তি ঘটান।