রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। মামলা গ্রহণের মতো পর্যাপ্ত উপাদান না থাকায় আবেদনটি খারিজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে তামান্না চৌধুরী প্রিয়াংকা নামে এক নারী বাদী হয়ে মামলাটি করার আবেদন করেন। আদালত প্রথমে বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে নথিপত্র ও উপস্থাপিত বক্তব্য পর্যালোচনা করে মামলা গ্রহণের মতো উপাদান না থাকায় আবেদনটি খারিজের আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালতের বিবেচনায় মামলাটি গ্রহণ করার মতো প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়া যায়নি।
মামলার আবেদনে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ড. আসিফ নজরুল ছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ড. সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান, সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীকে আসামি করা হয়।
এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, সদস্যসচিব আক্তার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য মো. হাসনাত আব্দুল্লাহ, নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসুদ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম এবং সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারাকেও আসামি করা হয়েছিল।
মামলার আবেদনে আরও ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্য, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ইলিয়াস হোসেন, অ্যাক্টিভিস্ট কনক সরোয়ার, নুরনবী (অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল), তাহরিমা জান্নাত সুরভী, মো. মিলন, ফাহিম আল চৌধুরী ও আবুল কালাম আজাদ।
আবেদনে যে অভিযোগ করা হয়
মামলার আবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আসামিদের প্রত্যক্ষ মদত, উসকানি ও সহযোগিতায় কয়েক হাজার মানুষ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবনে হামলা চালায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা লাঠিসোঁটা, হাতুড়ি ও দাহ্য পদার্থসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে সেখানে জড়ো হন।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, রাত আনুমানিক ১০টার দিকে হামলাকারীরা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। একই সঙ্গে সেখানে থাকা ঐতিহাসিক নিদর্শন, দলিলপত্র, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন নথি, প্রামাণ্যচিত্র, বই ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত এবং লুট করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, পরে দুটি বুলডোজার, খননযন্ত্র, ভারী হাতুড়ি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এনে ভবনটি ভাঙার কাজ শুরু করা হয়। রাতভর ভাঙচুরের পর পরদিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত স্থাপনাটির বড় অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে মামলার আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, মামলার কয়েকজন আসামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে এসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে উসকানি দেন। ভবনের ভেতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ নথি ও কাগজপত্র নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা মদত দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়। কেউ কেউ এ কাজে অর্থসহায়তা দিয়েছেন বলেও আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের অভিযোগ ছিল, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে হামলার পরিকল্পনা ও পূর্বঘোষণার বিষয়টি জানা থাকা সত্ত্বেও স্থাপনাটি রক্ষায় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি।
তবে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে করা মামলার আবেদন শেষ পর্যন্ত আদালতের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। আদালত জানিয়েছেন, মামলা গ্রহণ করার মতো প্রয়োজনীয় উপাদান না থাকায় আবেদনটি খারিজ করা হয়েছে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এই স্থাপনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে ঘিরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও স্থাপনাটির ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়। সেই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে করা সর্বশেষ এই মামলার আবেদনও আদালতের আদেশে খারিজ হলো।


