ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় বিজয়া দশমীর রাতে সামীর ঘোষ নামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক কর্মীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) রাতে ইংরেজবাজার থানার অন্তর্গত রামকেলি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানোর পর খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করা হয় বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার। এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে এ হত্যাকাণ্ডের তথ্য উঠে আসে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর রাতে প্রতিমা বিসর্জন নিয়ে যখন স্থানীয় বাসিন্দারা ব্যস্ত ছিলেন, তখনই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে পরিবারের অভিযোগ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার খবর পেয়ে জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী কারণ রয়েছে, কারা এতে জড়িত এবং ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা যাচাইয়ের পাশাপাশি অন্য সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
নিহতের পরিবারের দাবি, ঘটনার সময় সামীর ঘোষ বাড়িতে একাই ছিলেন। সেই সুযোগে কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি তাঁর বাড়িতে ঢুকে প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি কোপায়। পরে খুব কাছ থেকে পরপর গুলি চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট বিবরণ, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং হত্যাকাণ্ডে কতজন অংশ নিয়েছিল, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নিহতের ভাইয়ের অভিযোগ, বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার কারণে সামীরকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তাঁকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে দাবি পরিবারের। কিন্তু এসব হুমকি সত্ত্বেও সামীর নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে যাননি।
পরিবারের সদস্যরা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য স্থানীয় শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়ী করেছেন। নিহতের ভাইয়ের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তৃণমূলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর ভাইকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব।
এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে পরিবারের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ—সবকিছুই তদন্তের আওতায় রয়েছে।
রাজনৈতিক উত্তেজনার আশঙ্কা, এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা
বিজয়া দশমীর রাতে এমন সহিংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রামকেলি ও আশপাশের এলাকায় উদ্বেগ এবং উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য সংগ্রহ করতে পারে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য যাচাই করছে।
এ ধরনের ঘটনায় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে হামলার আগে ও পরে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি, নিহতের সঙ্গে কারও সাম্প্রতিক বিরোধ ছিল কি না এবং পরিবারের পক্ষ থেকে আগে কোনো হুমকির অভিযোগ জানানো হয়েছিল কি না। তবে এসব বিষয়ে তদন্তকারীদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু অভিযোগ এবং প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তদন্তে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা যায় না। একইভাবে, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করার অর্থও এই নয় যে তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।
পুলিশের তদন্তে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য, হামলাকারীদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবারের দাবি অনুযায়ী আগে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়ে থাকলে, সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
মালদহের এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে সামীর ঘোষের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে পুলিশি তদন্তের ফলই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং অন্য জড়িতদের শনাক্ত করার মধ্য দিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।


