কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: 8শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ | ২২ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
গত বছরের ৫ আগষ্ট বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার বিজয় মিছিলে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন শহীদ হাফেজ মোহাম্মদ জুবায়ের আহমদ (১৭)। পরদিন ৬ আগষ্ট সকালে ময়নাতদন্ত ছাড়াই কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের লাহিনীপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানের দাফন করা হয় মরদেহটি। তবে আদালতের নির্দেশ দাফনের প্রায় নয় মাস পরে কবর থেকে মরদেহ তুলতে আসেন একজন ম্যাজিস্ট্রেটসহ একটি প্রশাসনিক দল। কিন্তু শহীদ জুবায়েরের স্বজনদের আপত্তি থাকায় কবর জিয়ারতের পরে মরদেহটি উত্তোলন না করেই ফিরে গেলেন তাঁরা।
বৃহস্পতিবার (২২ মে) দুপুর ২ টা ১৮ মিনিটে কুমারখালীর লাহিনীপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে ঘটে এ ঘটনা। শহীদ জুবায়েরের ওই এলাকার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের ছেলে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, কবরস্থানে উৎসুক জনতা। প্রশাসনের দলটি দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এরপর শহীদ জুবায়েরের কবরটি জিয়ারত করে মরদেহটি উত্তোলন না করেই ফিরে গেলেন।
এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক আহমেদ বলেন, শুনলাম কবর থেকে একজন ৫ আগষ্টে নিহত শহীদের লাশ তোলা হবে। তবে এসে দেখি পরিবার লাশ তুলতে বাধা দিচ্ছে। ম্যাজিস্ট্রেট লাশ না তুলেই চলে গেলেন।
সেদিন শহীদ জুবায়েরের মরদেহটি গোসল করিয়েছিলেন লাহিনীপাড়ার মৃত আসাদ প্রামাণিকের ছেলে রেজাউল করিম। তিনি বলেন, গোসলের সময় দেখলাম গুলিটি বুকের বাম স্তন দিয়ে ঢুকে ডান পাজর দিয়ে বেরিয়ে গেছে। একটা গুলিই লেগেছিল।
জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগষ্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর বিকেলে ঢাকা খিলগাঁও চৌরাস্তা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতা একটি বিজয় মিছিল বের করেন। সেই মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। সেদিন পুলিশের ছোড়া গুলিতে আহত হন হাফেজ মোহাম্মদ জুবায়ের আহমদ। এরপর তাকে প্রথমে খিদগাহ হাসপাতাল এবং পরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। পরদিন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর লাহিনীপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানের সামাজিকভাবে মরদেহটি দাফন করা হয়।
আরও জানা গেছে, এ ঘটনায় ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর খিলগাঁও থানায় তাঁর বাবা মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবাইদুল কাদেরসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে অসংখ্য। উক্ত মামলায় তদন্তের স্বার্থে বিজ্ঞ আদালত চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কবর থেকে মরদেহটি উত্তোলেন নির্দেশ দেন। বাদীর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদিত্য পালের নেতৃত্বে একটি প্রশাসনিক দল কবর থেকে মরদেহটি উত্তোলন করতে আসেন। তবে বাদীর আপত্তি থাকায় মরদেহটি না তুলেই চলে যান তাঁরা।
এ বিষয়ে মামলার বাদী মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, বিজয় মিছিলে গিয়ে আমার সন্তান পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। হাসপাতালের প্রতিবেদনে গুলির কথা লেখা রয়েছে। সুতরাং পরীক্ষার জন্য আর মরদেহটি উত্তোলনের দরকার নাই। সেজন্য মরদেহটি উত্তোলনে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছি।
এ সময় কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘ সেদিন বিকেলে বিজয় মিছিলে সবাই ঈদের আনন্দ করতিছিল। কিন্তু বিজয় মিছিলেও আমার চোখে জল ছিল। আজও আমাদের চোখে জল। আমি ঘাতকদের প্রচলিত আইনে বিচার চাই।’
আদালতের নির্দেশে এবং বাদীর দেওয়া সময় মতে কবর থেকে শহীদ জুবায়েরের মরদেহটি উত্তোনৈ করতে আসা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদিত্য পাল। তিনি বলেন, বাদীর আপত্তি থাকায় মরদেহটি উত্তোলন না করে লিখিত বক্তব্য নিয়ে চলে যাচ্ছি। বিষয়টি বিজ্ঞ আদালতকে জানানো হবে।
তদন্তে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রো সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. বদিউজ্জামান। তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত এখনই বলা যাচ্ছে না।
খবরওয়ালা/আরডি