নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: 10শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ | ২৪ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পদত্যাগের ইচ্ছাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম অস্তিরতা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করার পর থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে কয়েকটি রাজনৈতিক দল, প্রশাসনের বিভিন্ন অংশ ও অভ্যুত্থানের শরিক গোষ্ঠীগুলো। তাঁকে দায়িত্বে রাখার জন্য নানা পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। কেউ কেউ তাঁর কাছে ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। তবে প্রফেসর ইউনূস শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
আজ তাঁর উপদেষ্টাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে বোঝা যাবে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে—প্রধান উপদেষ্টা দায়িত্বে থাকছেন, না অন্য কোনো পথ বেছে নিচ্ছেন। সূত্র জানিয়েছে, নানাপক্ষের অনুরোধ ও পরামর্শে ড. ইউনূস আপাতত দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন। তবে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। উপদেষ্টা পরিষদের আকার ছোট করার বিষয়টি নিয়েও ভাবনা চলছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তৈরি হওয়া দূরত্ব কমানোর বিষয়েও সরকারের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি উদ্যোগী হচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন পক্ষ থেকে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবও সামনে এসেছে। এমনকি একটি দল সর্বদলীয় বৈঠকের প্রস্তাবও দিয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী, দুই এক দিনের মধ্যেই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব, নতুন সংকটের উৎস
পরিস্থিতির এই উত্তেজনার মূল কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)-র সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বিএনপি গত চার দিন ধরে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ চেয়েও তা পাননি। জামায়াত ইসলামী পক্ষ থেকেও সর্বদলীয় বৈঠকের বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করা হলেও সরকার কোনো সাড়া দেয়নি। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করছে, নবগঠিত এনসিপির প্রতি সরকারের স্পষ্ট পক্ষপাত রয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রমতে, প্রধান উপদেষ্টা বর্তমানে একটি ‘অশুভ চক্রে’ ঘেরাও হয়ে পড়েছেন। এই চক্রে সরকারের চারজন সদস্য এবং বাহিরের আরও তিনজন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তারা চায় না নির্বাচন হোক, বরং ভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। প্রফেসর ইউনূস যখন হতাশ হয়ে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন এই চক্রই নতুনভাবে গুজব রটাতে শুরু করে—যেমন তিনি পদত্যাগ করছেন, জরুরি অবস্থা জারি হতে যাচ্ছে ইত্যাদি। বাস্তবে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ নয় বলে জানিয়েছে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র।
নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা
বর্তমান সংকটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু নির্বাচন ইস্যু। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ জামান সম্প্রতি অফিসার্স অ্যাড্রেসে বলেন, আগামী ডিসেম্বরেই নির্বাচন হওয়া উচিত। একইসঙ্গে তিনি সরকারে থাকা অবস্থায় নানা বিষয়ে হতাশাও প্রকাশ করেন।
এদিকে বন ও পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বৃহস্পতিবার বলেন, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে, এর বাইরে নয়। তবে তিনি জানান, শুধু নির্বাচন আয়োজন নয়, এই সরকার সংস্কারমুখী দায়িত্ব পালনের জন্য ক্ষমতায় এসেছে।
তবে এখনও পর্যন্ত সরকার নির্বাচন বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করেনি। এনসিপি নির্বাচন নিয়ে অন্যান্য দলের বিপরীত অবস্থান নিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চলমান সংকট উত্তরণের জন্য জাতীয় সরকার গঠন, উপদেষ্টা পরিষদের পুনর্বিন্যাস ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ—এই তিনটি বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে প্রধান উপদেষ্টার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। আজকের বৈঠকের পর তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ বহুল প্রতীক্ষিত।
খবরওয়ালা/এমএজেড