খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২১ জুন ২০২৫
ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে সরাসরি বৈঠকের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য দূতের মাধ্যমে কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তিনি। এমন তথ্য জানিয়েছেন দেশটির জরুরি যুদ্ধ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত তিনজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েলি হামলায় শীর্ষ সহযোগীরা নিহত হওয়ার পর খামেনি তার সামরিক কমান্ড চেইনে একাধিক বিকল্প কমান্ডার ঠিক করে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, খামেনি নিজেই তিনজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতার নাম মনোনীত করেছেন, যাতে কোনোভাবে তার মৃত্যু হলে উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতা না তৈরি হয়।
তবে কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, খামেনির ছেলে মুজতবা খামেনি, যিনি নিজেও একজন আলেম এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত, তাকে উত্তরাধিকারীর তালিকায় রাখা হয়নি। ইরানের সাবেক রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিকেও একসময় খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে শক্তিশালী প্রার্থী মনে করা হতো, তবে ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন।

শুক্রবার সেন্ট পিটার্সবার্গ ফোরামে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ইরান ইস্যুতে আশঙ্কা প্রকাশের পরপরই ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের এই চিত্র আরও স্পষ্ট হচ্ছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের হঠাৎ হামলা ১৯৮০-র দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর ইরানের উপর সবচেয়ে বড় সামরিক আঘাত। রাজধানী তেহরানেই কয়েক দিনের হামলায় এত ক্ষতি হয়েছে যা সাদ্দাম হোসেনের আট বছরের যুদ্ধে হয়নি।
ইরান প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে প্রতিদিন পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তু হিসেবে হাসপাতাল, তেল শোধনাগার, উপাসনালয় ও বাসাবাড়ি আঘাত হেনেছে বলে দাবি করছে ইরান।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, খামেনি খুবই সচেতন যে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র তাকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে, আর সে ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে শহীদ বলেই দেখবেন। তবে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে তিনি দেশের বিশেষ ধর্মীয় পরিষদকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন দ্রুত তার মনোনীত তিন প্রার্থীর মধ্য থেকে একজনকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
ইরানে সর্বোচ্চ নেতা শুধু রাষ্ট্রপ্রধানই নন; সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক, বিচার বিভাগ, সংসদ ও নির্বাহী শাখারও প্রধান। এ কারণেই উত্তরাধিকার ইস্যু খুবই স্পর্শকাতর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।’
যুদ্ধ শুরুর পর খামেনি দুইটি ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘ইরানি জনগণ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে মাথা নত করবে না।’ তেহরানে তার বাসভবন ‘বেইত রাহবারি’-তে সাধারণত তিনি সপ্তাহে শীর্ষ কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু এখন তিনি বাঙ্কারে অবস্থান করছেন।
ইসরায়েলি হামলা দুইটি ফ্রন্টে চলছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। একদিকে বিমান হামলা—সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় বোমা বর্ষণ। অন্যদিকে, গোপনে ইসরায়েলি এজেন্টরা ড্রোন হামলা করছে। এতে ইরানের নিরাপত্তা সংস্থা তীব্র শঙ্কায় আছে। এক উপদেষ্টা অডিও বার্তায় বলেছেন, ‘আমাদের বড় ব্যর্থতা হলো—ইসরায়েলি পরিকল্পনা ও অস্ত্র গোপনে দেশে ঢোকার তথ্য আমরা ধরতে পারিনি।’
এখন শীর্ষ তিন উদ্বেগ:
১) খামেনিকে হত্যাচেষ্টা,
২) যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো,
৩) গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আরও বড় হামলা।

যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে নামলে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংসে ইসরায়েলের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রই বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান সরকার ইন্টারনেট প্রায় বন্ধ করে রেখেছে, বিদেশি কল ব্লক করেছে। কর্মকর্তাদের ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনগণকে সন্দেহভাজন ব্যক্তির তথ্য দিতে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছবি না তুলতে বলা হয়েছে।
শুক্রবার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ঘোষণা করেছে, ‘শত্রুপক্ষের সঙ্গে মিলে যারা কাজ করছে, তারা রোববারের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।’
ইসরায়েলি হুমকিতে রাজধানী তেহরানের কিছু জনবহুল এলাকা ফাঁকা হয়ে গেছে। রাস্তায় পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চলছে।

রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও এখন পুরো দেশ শাসকের পক্ষে একতাবদ্ধ—বলেন এক প্রভাবশালী রাজনীতিক। মানবাধিকারকর্মী নরগেস মোহাম্মদি বলেছেন, ‘গণতন্ত্র যুদ্ধ দিয়ে আসবে না।’
সাধারণ মানুষও একে অপরকে সহায়তা করছে—হোটেল, অতিথিশালা শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্র হয়েছে, সাইকোলজিস্টরা বিনামূল্যে থেরাপি দিচ্ছেন, দোকানদার ছাড় দিচ্ছেন, রুটি কিনতে লাইনে একাধিক রুটি না নিয়ে অন্যকে সুযোগ দিচ্ছেন। এক ব্যবসায়ী বলেছেন, ‘আমরা ভয় পেয়েছি, তবুও একে অপরকে ভালোবাসা আর সহমর্মিতা দিচ্ছি। আমরা একসাথে আছি, এটিই আমাদের ইরান।’
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
খবরওয়ালা/এন