খবরওয়ালা বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৬ জুলাই ২০২৫
আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগে, ২০২০ সালের ৬ জুলাই বাংলা সংগীত জগতে নেমে এসেছিল গভীর শোকের ছায়া। না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাংলাদেশের ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ এন্ড্রু কিশোর। কোটি মানুষের হৃদয় জুড়ে যিনি আজও বেঁচে আছেন তার অনবদ্য সুর আর অতুলনীয় গায়কীর মাধ্যমে। সময়ের ব্যবধানে তার শারীরিক অনুপস্থিতি মেনে নিতে হলেও, তার কণ্ঠের স্পর্শে গড়া হাজারো গান আজও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।
১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন এন্ড্রু কিশোর। ছোটবেলা থেকেই গান ছিল তার জীবনের অন্যতম আবেগ। সংগীতে প্রাথমিক শিক্ষা নেন আব্দুল আজিজ বাচ্চুর কাছে। রাজশাহী বেতারেই তার সংগীতযাত্রার সূচনা, তবে তার প্লেব্যাক ক্যারিয়ারের অভিষেক ঘটে ১৯৭৭ সালে মেইল ট্রেন চলচ্চিত্রের “অচিনপুরের রাজকুমারী, নেই যে তার কেউ” গানটির মাধ্যমে।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এন্ড্রু কিশোরকে। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল তার কণ্ঠের। গানের প্রতি তার নিবেদন, দক্ষতা এবং আবেগ তাকে পৌঁছে দেয় ‘প্লেব্যাক সম্রাট’-এর আসনে। তার গলায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে প্রেম, বিরহ, দেশপ্রেমসহ জীবনের নানা রঙ ও অনুভূতি।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি সর্বমোট আটবার শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর স্বীকৃতি লাভ করেন। এটি কেবল তার প্রতিভার স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলা সংগীতে তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেরও প্রমাণ।
এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানের তালিকায় রয়েছে— “জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প”, “ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে”, “সবাই তো ভালোবাসা চায়”, “আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি”, “ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা”, “ভালো আছি ভালো থেকো”, “তুমি আমার জীবন”, “পড়ে না চোখের পলক”— প্রভৃতি। এসব গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে, কখনও আনন্দে, কখনও বেদনায়।
তাঁর মৃত্যুর পর সংগীতাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহকর্মী, ভক্ত, এবং সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তবে মৃত্যু এন্ড্রু কিশোরকে থামাতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার গানের নতুন করে উপস্থাপন, বিভিন্ন ট্রিবিউট কনসার্ট, এবং নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে তার গানগুলো পুনরায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা— এসবই প্রমাণ করে যে তিনি আজও প্রাসঙ্গিক।
ব্যক্তি এন্ড্রু কিশোর ছিলেন ভীষণ বিনয়ী, সজ্জন ও বন্ধুবৎসল। শিল্পী হিসেবে যেমন অনন্য, মানুষ হিসেবেও ছিলেন হৃদয়ছোঁয়া।
এন্ড্রু কিশোরের মতো শিল্পীরা যুগে যুগে জন্ম নেন না। তার প্রতিভা, নিষ্ঠা ও অবদানের মাধ্যমে তিনি বাংলা সংগীতকে এনে দিয়েছেন এক নতুন উচ্চতা। তার প্রয়াণ নিঃসন্দেহে এক অপূরণীয় ক্ষতি, কিন্তু তার সৃষ্টিকর্ম তাঁকে বাংলা গানের ইতিহাসে চিরজীবী করে রেখেছে।
বাংলা গানের আকাশে তিনি এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা— যিনি নিজের কণ্ঠের আলোয় পথ দেখিয়ে যাবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
খবরওয়ালা/আরডি