খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথিদের গরুর মাংস কম দেওয়া এবং তা জমা করে রাখাকে কেন্দ্র করে কনে পক্ষ ও স্থানীয় গ্রামবাসীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার বিকেলে উপজেলার কালামৃধা ইউনিয়নের দেওড়া নয়াকান্দা গ্রামে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। মাংস পরিবেশন নিয়ে সৃষ্ট এই সাধারণ বিতর্ক একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নেয় এবং এতে নারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন ব্যক্তি আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের খবর পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সোমবার দেওড়া নয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা লাভলু শেখের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুরের পর খাওয়া-দাওয়ার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়। খাওয়া-দাওয়ার একপর্যায়ে টেবিলে বসা গ্রামবাসী অতিথিদের গরুর মাংস কম দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। একই সাথে কনে পক্ষের লোকজন দাবি করেন, গ্রামের কয়েকজন অতিথি তাদের পাতে দেওয়া মাংস সম্পূর্ণ না খেয়ে টেবিলের নিচে খামাল দিয়ে বা জমা করে রাখছেন।
এই বিষয়টি নিয়ে প্রথমে কনে পক্ষের পরিবেশনকারী ও গ্রামবাসী অতিথিদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে এই সাধারণ বিতর্কটি চারপাশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা মুহূর্তের মধ্যে লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই তীব্র সংঘাতের সময় উভয় পক্ষ একে অপরকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। এতে বিয়ে বাড়ির আনন্দঘন পরিবেশ মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং কনের বাবা, দাদাসহ বেশ কয়েকজন নারী ও পুরুষ গুরুতর আহত হন।
এই দেড় ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন ব্যক্তি কমবেশি আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ মিয়া (৩৪), সহিদ মাতুব্বর (৪৫), ছোরাপ মাতুব্বর (৫০) এবং মমতাজ বেগম (৪০) এর নাম প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনার পরপরই কনে পক্ষ ও গ্রামবাসীর সহায়তায় গুরুতর আহত ৪ জনকে উদ্ধার করে দ্রুত ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা আহতদের প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসা প্রদান করেছেন। অন্যদিকে, সংঘর্ষে সামান্য আহত হওয়া অন্যান্য ব্যক্তিরা স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে এবং প্রাথমিক সেবা কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন বলে জানা গেছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানের এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার বিষয়ে কনের বাবা লাভলু শেখ গণমাধ্যমের কাছে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি লিখিত বক্তব্য ও অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তিনি দাবি করেন, কেবল মাত্র মাংস কম দেওয়া বা জমা রাখার মতো সাধারণ বিষয় নিয়ে এই হামলা হয়নি, বরং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক গ্রুপিংয়ের জেরে পরিকল্পিতভাবে তার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে এই হামলা চালানো হয়েছে।
লাভলু শেখ আরও অভিযোগ করেন যে, হামলাকারীরা বিয়ে বাড়িতে ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। তারা বিয়ের উপহার ও নেছার (সাংস্কৃতিক বা সামাজিক প্রথা অনুযায়ী প্রাপ্ত উপহারের অর্থ) বাবদ আমন্ত্রিত অতিথিদের কাছ থেকে উত্তোলিত নগদ প্রায় ২ লাখ টাকা জোরপূর্বক লুট করে নিয়ে গেছে। এর পাশাপাশি হামলাকারীরা অনুষ্ঠানস্থলের ডেকোরেটরের বিভিন্ন মূল্যবান সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে বিপুল পরিমাণের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে বলেও তিনি সুনির্দিষ্ট দাবি জানান।
কালামৃধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল মাতুব্বর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিয়ে বাড়িতে মূলত গরুর মাংস খাওয়া এবং তা কম দেওয়াকে কেন্দ্র করেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল। ঘটনার পর পরই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষকে শান্ত করা হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যস্থতায় বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে মীমাংসা করা হয় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া বিয়ের বাকি আনুষ্ঠানিকতা স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানে মাংস খাওয়া নিয়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল এবং এতে কয়েকজন আহত হওয়ার খবর আমরা পেয়েছি। খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। পরবর্তীতে স্থানীয় মুরব্বি ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যস্থতায় বিষয়টি সামাজিকভাবে আপস-মীমাংসা করা হয়েছে। তবে কনের বাবার লুটপাট ও ভাঙচুরের দাবির প্রেক্ষিতে তিনি জানান, এই ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো পক্ষই লিখিত বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেনি। পরবর্তীতে থানায় কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রাপ্ত হলে পুলিশ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।