খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: 27শে আষাঢ় ১৪৩২ | ১১ই জুলাই ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
এবারকার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ভয়াবহ ফল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গণিতে খারাপ ফলাফলের প্রভাব পড়েছে সার্বিক পাসের হারে। যদিও ইংরেজিতেও শিক্ষার্থীরা খারাপ করেছে, তবে তা গণিতের মতো এতটা প্রকট নয়। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে প্রায় ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে অকৃতকার্য হয়েছে, যেখানে ইংরেজিতে ফেল করেছে ১৩ শতাংশ। উভয় বিষয়েই ফেলের হার গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি। এছাড়া মানবিক বিভাগে ৪৬ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় প্রায় ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে, যা সামগ্রিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফল পর্যালোচনায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া বা পাসের হার বাড়ানোর প্রবণতা থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সরে এসেছে। বোর্ড থেকে অপ্রাসঙ্গিক ও ভুল উত্তরে নম্বর না দেওয়া এবং যথাযথ মূল্যায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে ফলাফলে প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি, মাদ্রাসা বোর্ডের দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ও দাখিল (ভোকেশনাল) সহ মোট ১১টি বোর্ডের ফল প্রকাশিত হয়। এতে সর্বমোট পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৮.৪৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ১৪.৫৯ শতাংশ কম।
এবারের পাসের হার শুধু গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নই নয়, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। এবার মোট ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা গত বছর ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন। অর্থাৎ জিপিএ-৫ কমেছে ৪৩ হাজার ৯৭টি। তবে এবারও ছাত্রীরা ভালো করেছে; ছাত্রদের চেয়ে তাদের পাসের হার প্রায় ৪ শতাংশ বেশি এবং ৮ হাজার ২০০ বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
৯টি সাধারণ বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬৭.৫১ শতাংশ (জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৭০৬৮ জন), রাজশাহীতে ৭৭.৬৩ শতাংশ (জিপিএ-৫ ২২৩২৭ জন), কুমিল্লায় ৬৩.৬০ শতাংশ (জিপিএ-৫ ৯৯০২ জন), যশোরে ৭৩.৬৯ শতাংশ (জিপিএ-৫ ১৫৪১০ জন), চট্টগ্রামে ৭২.০৭ শতাংশ (জিপিএ-৫ ১১৮৪৩ জন), বরিশালে ৫৬.৩৮ শতাংশ (জিপিএ-৫ ৩১১৪ জন), সিলেটে ৬৮.৫৭ শতাংশ (জিপিএ-৫ ৩৬১৪ জন), দিনাজপুরে ৬৭.০৩ শতাংশ (জিপিএ-৫ ১৫০০৬২ জন) এবং ময়মনসিংহে ৫৮.২২ শতাংশ (জিপিএ-৫ ৬৬৭৮ জন)। মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৬৮.৯ শতাংশ (জিপিএ-৫ ৯০০৬ জন) এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৭৩.৬৩ শতাংশ (জিপিএ-৫ ৪৯৪৮ জন)।
এদিকে, পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার পেছনে পরীক্ষার হল এবং খাতা মূল্যায়নে ‘কড়াকড়ি’কে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা। এটিকে শিক্ষার প্রকৃত মান যাচাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে বাস্তবসম্মত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দেড় দশক ধরে খাতা মূল্যায়নে উদারনীতির কারণে দেশে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন ছিল। ২০১০ সালে সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পর থেকে খাতা মূল্যায়নে উদার হওয়ার প্রবণতা ব্যাপকতা পায়। পরীক্ষকদের মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যে, খাতায় কিছু লেখা থাকলেই যেন নম্বর দেওয়া হয়, যার ফলে পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সংখ্যায় উল্লম্ফন ঘটে। এতে শিক্ষার সার্বিক মান নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন ওঠে।
এ বিষয়ে বুধবার শিক্ষা উপদেষ্টা ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেছেন, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষার্থীদের মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৬ বছরে সরকার নিজেদের সাফল্য দেখানোর জন্য শিক্ষার্থীদের নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বাড়িয়ে ফলাফলের ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রকাশ করত। এমনকি সেই ফল প্রকাশ নিয়ে সরকারপ্রধানের এক ধরনের ফটোসেশনের আয়োজন থাকত, যা অন্তর্বর্তী সরকার বাহুল্য মনে করছে। এ থেকে সরে এসে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতার প্রকৃত মূল্যায়নে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে রেজাল্ট প্রকাশের কারণে অতীতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মূল্যায়ন না হওয়ায় তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। এবার জিপিএ-৫ নয়, প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং আগামী দিনেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
ফল বিশ্লেষণে পাসের হার কমে যাওয়ার পেছনে আরও দুটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। প্রথমত, মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৫৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৬৬ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ, মানবিকে প্রায় ৪৬ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় প্রায় ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে, যা সার্বিক পাসের হারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দ্বিতীয়ত, গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের তুলনামূলক খারাপ ফল। এবার মোট ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নেয়, যার মধ্যে পাস করেছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন এবং ফেল করেছে ৬ লাখ ৬৬০ জন ছাত্রছাত্রী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারের সর্বনিম্ন পাসের হার বরিশাল বোর্ডে (৫৬ শতাংশ) এবং এরপর ময়মনসিংহ বোর্ড (৫৮ শতাংশ)। ফেল করা এসব শিক্ষার্থীর অধিকাংশই গ্রামের এবং সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তান।
বিগত বছরগুলোতে এসএসসি পরীক্ষার ফল কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হতো, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ফল প্রকাশের ঘোষণা দিতেন। এরপর শিক্ষার্থীরা ফল জানতে পারতেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর সচিবালয় অথবা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষামন্ত্রী সব বোর্ড চেয়ারম্যানকে নিয়ে ফলাফলের সারসংক্ষেপ তুলে ধরতেন। তবে এবার সেই নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফল ঘোষণার সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
এদিন দুপুর ২টার দিকে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল কবির। একই সময়ে স্ব স্ব শিক্ষা বোর্ড ফল প্রকাশ করে। শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় ও নিজ শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে ফল সংগ্রহ করেন।
এ সময় আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, যে ফল প্রকাশিত হয়েছে সেটি প্রকৃত ও সত্য। শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়নি। সামগ্রিকভাবে এবারের ফলে প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। তিনি আরও বলেন, তাদের ওপর মহল থেকে কোনো ধরনের চাপ ছিল না; শুধু বলা হয়েছিল, যে রেজাল্ট হবে, সেটিই দিতে হবে। পরীক্ষকদেরও যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়নের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কাজেই বাস্তব ও সত্য ফল বেরিয়ে এসেছে এবং শিক্ষকদের সঠিক মূল্যায়ন করতে বাধ্য করা হয়েছে।
বরিশাল বোর্ডে পাসের হার কমার বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, বরিশাল অঞ্চলে খাল-বিলসহ প্রান্তিক এলাকা বেশি হওয়ায় সেসব অঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা একটু কঠিন হয়।
প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে বরিশাল বোর্ড, যেখানে পাসের হার মাত্র ৫৬.৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৪৪ জন ফেল করেছে। সবচেয়ে ভালো ফল করেছে রাজশাহী বোর্ড, যার পাসের হার ৭৭.৬৩ শতাংশ। এছাড়া, ১১টি বোর্ডে মেয়েদের পাসের হার ৭১.০৩ শতাংশ এবং ছেলেদের ৬৫.৮৮ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৩ হাজার ৬১৬ জন মেয়ে এবং ৬৫ হাজার ৪১৬ জন ছেলে। পাসের হার ও জিপিএ উভয় ক্ষেত্রেই মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে।
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সারা দেশে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৮৪টি। অন্যদিকে, ১৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি। মোট প্রতিষ্ঠান ছিল ৩০ হাজার ৮৮টি। এবার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, তবে পরীক্ষার কেন্দ্র কমেছে।
চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ১০ এপ্রিল এবং শেষ হয় ১৩ মে। এ পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছিল ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন, যার মধ্যে ছাত্রী ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৯ জন এবং ছাত্র ৯ লাখ ৬১ হাজার ২৩১ জন। সারা দেশের ৩ হাজার ৭১৪টি কেন্দ্রে ২৮ হাজার ৯২৮ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ১৯ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে এই ফল প্রকাশ করা হলো।
গত ১৫ বছরের ফলাফল
২০১০: ৮০.৭৪ শতাংশ
২০১১: ৮২.১৬ শতাংশ
২০১২: ৮৬.৩৭ শতাংশ
২০১৩: ৮৯.৩৪ শতাংশ
২০১৪: ৯১.৩৪ শতাংশ
২০১৫: ৮৭.০৪ শতাংশ
২০১৬: ৮৮.৭০ শতাংশ
২০১৭: ৮০.৩৫ শতাংশ
২০১৮: ৭৭.৭৭ শতাংশ
২০১৯: ৮২.২০ শতাংশ
২০২০: ৮২.৮৭ শতাংশ
২০২১: ৯৩.৫৮ শতাংশ (করোনার বছরে অটোপাস)
২০২২: ৮৭.৪৪ শতাংশ
২০২৩: ৮০.৩৯ শতাংশ
২০২৪: ৮৩.০৪ শতাংশ
এসএসসির ফল চ্যালেঞ্জের সুযোগ
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় যারা কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি, তারা পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন বা খাতা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। এই কার্যক্রম আজ (শুক্রবার) থেকে শুরু হয়ে ১৭ জুলাই পর্যন্ত চলবে। প্রতিটি বিষয়ে আবেদনের ফি ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
খবরওয়ালা/টিএস