খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর চ্যাটবট ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যাপক হারে ব্যবহার শুরু করায় এরই মধ্যে বহু পেশাজীবী চাকরি হারিয়েছেন। অনেকেই আবার চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন, বিশেষ করে শ্রমনির্ভর ও সাধারণ কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা সতর্ক করেছেন—আসছে কয়েক বছরের মধ্যেই এআইয়ের কারণে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনার সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জেনারেটিভ এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির ফলে সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা এখন বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন। ‘ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও ‘রিট্রিভাল অগমেন্টেড জেনারেশন (RAG)’—এই ধরনের নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন না করলে আগামী দিনে ৮০ শতাংশ সফটওয়্যার প্রকৌশলীর চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অ্যামাজনের সিইও অ্যান্ডি জ্যাসি গত জুনে সতর্ক করে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের কারণে ভবিষ্যতে কোম্পানিগুলো তাদের করপোরেট কর্মীসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনবে। তিনি বলেন, এআই দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীসংখ্যা হ্রাসের পথও প্রশস্ত করবে। ইতোমধ্যেই অ্যামাজন তাদের নিজস্ব কার্যক্রমে এআই ব্যবহার শুরুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
এআইভিত্তিক স্টার্টআপ ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর প্রধান নির্বাহী দারিও আমোডেই গত মে মাসে অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, অফিসের প্রাথমিক স্তরের অর্ধেকের বেশি চাকরি ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তির কারণে হারিয়ে যেতে পারে।
এদিকে প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট চলতি বছর আবারও বড় পরিসরে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে, যা তাদের মোট কর্মীর প্রায় ৪ শতাংশ। এর আগে মে মাসে তারা চতুর্থ দফায় ৬ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছিল।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) বিশ্লেষণ তুলে ধরে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, উন্নত দেশগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশ চাকরি এআইয়ের প্রভাবে পড়বে। সামগ্রিকভাবে বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার মতে, এআই শ্রমবাজারে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেবে।
তবে এই বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। সম্প্রতি এক বক্তব্যে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এআই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনবে। যদিও অনেকে আশঙ্কা করছেন যে এআই বহু মানুষকে চাকরিহীন করবে, কিন্তু বিল গেটসের মতে, ইতিহাস বলছে—প্রতিটি নতুন প্রযুক্তির আগমনে প্রথমে ভয় তৈরি হলেও পরে তা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই-ভিত্তিক যুগে টিকে থাকতে হলে শুধু একমুখী দক্ষতা যথেষ্ট নয়। এআই সংক্রান্ত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হলে কম্পিউটার সায়েন্স ও প্রোগ্রামিং জ্ঞানের পাশাপাশি গণিত, পরিসংখ্যান, বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের ওপরও ভালো দখল থাকা জরুরি। কারণ, আধুনিক বিশ্বের সমস্যাগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক, আর তা সমাধানে প্রয়োজন আন্তঃবিষয়ক (interdisciplinary) জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি।