খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১১ আগস্ট ২০২৫
ম্যাকডোনাল্ডস, কোকা-কোলা, অ্যামাজন, অ্যাপলসহ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি ভারতে বয়কটের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির প্রতিবাদে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সমর্থক এবং ব্যবসায়ী নেতারা এই বয়কট আন্দোলন জোরদার করছেন।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত, বহু বছর ধরেই মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোক্তাদের টার্গেট করে এসব কোম্পানি দেশে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
ভারতে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ, ডমিনোজের রেস্তোরাঁর সংখ্যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি, কোকা-কোলা ও পেপসি সর্বত্র পাওয়া যায়, আর অ্যাপল স্টোর বা ডিসকাউন্ট দেওয়া স্টারবাকস খুললেই সেখানে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়।
বয়কট ডাকে এখনই বিক্রিতে প্রভাব নেই, তবে উদ্বেগ বাড়ছে
বর্তমানে মার্কিন ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রিতে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের পতনের কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মাঠ পর্যায়ে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের প্রচার বাড়ছে। বিশেষ করে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর এই বয়কট আন্দোলন নতুন গতি পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বাণিজ্য উত্তেজনা ভারতের রপ্তানিকারকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দিল্লি-ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সম্পর্কেও চাপ তৈরি করেছে।
মোদীর ‘আত্মনির্ভর’ আহ্বান
রোববার বেঙ্গালুরুতে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীকে ‘আত্মনির্ভর’ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিশ্বে পণ্য তৈরি করেছে, কিন্তু এখন ভারতের প্রয়োজনকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার সময়।’
এই আহ্বানের সুর মেলান দেশীয় উদ্যোক্তারাও। দেশটির বিউটি ওয়েলনেস ব্র্যান্ড ‘ওয়াও স্কিন সায়েন্স’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা মনীশ চৌধুরী এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’কে বৈশ্বিক আসক্তি বানাতে হবে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে শিখতে হবে, যাদের খাবার ও বিউটি প্রোডাক্ট বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা হাজার হাজার মাইল দূরের পণ্যের জন্য লাইন দিয়েছি। আমরা গর্বের সঙ্গে এমন ব্র্যান্ডে খরচ করেছি, যা আমাদের নয়, অথচ আমাদের দেশের প্রস্তুতকারকেরা নিজেদের দেশে মনোযোগ পেতে লড়াই করছে।’
ভারতীয় টেক জায়ান্টের স্বপ্ন
রাইড-হেইলিং কোম্পানি ড্রাইভইউ-এর সিইও রাহম শাস্ত্রী লিংকডইনে লেখেন, ‘ভারতের নিজস্ব টুইটার/গুগল/ইউটিউব/হোয়াটসঅ্যাপ/ফেসবুক থাকা উচিত—যেমন চীনের আছে।’
হোয়াটসঅ্যাপে দেশীয় পণ্যের তালিকা
বিজেপির সহযোগী সংগঠন স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ দেশজুড়ে ক্ষুদ্র জনসভা ও প্রচারণা চালাচ্ছে। সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক অশ্বিনী মহাজন বলেন, ‘মানুষ এখন ভারতীয় পণ্যের দিকে তাকাচ্ছে। ফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে। এটি জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেমের ডাক।’
তিনি আরও জানান, তাঁরা হোয়াটসঅ্যাপে একটি তালিকা ছড়াচ্ছেন যেখানে বিদেশি ব্র্যান্ডের বিকল্প দেশীয় ব্র্যান্ডের নাম—সাবান, টুথপেস্ট থেকে ঠান্ডা পানীয় পর্যন্ত—দেওয়া আছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো একটি গ্রাফিকের শিরোনাম, ‘বিদেশি ফুড চেইন বয়কট করুন’, যেখানে ম্যাকডোনাল্ডসসহ বিভিন্ন আমদানি-নির্ভর রেস্তোরাঁর লোগো রয়েছে।
তবুও মার্কিন পণ্যে ভরসা
সবাই অবশ্য বয়কট ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না। লখনউ শহরের ৩৭ বছর বয়সী রাজত গুপ্ত সোমবার ম্যাকডোনাল্ডসে বসে বলেন, ‘শুল্ক কূটনীতির ব্যাপার, আমার ম্যাকপাফ আর কফিকে এতে টানা উচিত নয়।’
তিনি জানান, ৪৯ রুপিতে তিনি ভালো মানের কফি পান, যা মূল্য অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত।
টেসলা চালু করল দ্বিতীয় শোরুম
এই উত্তেজনার মধ্যেও সোমবার নয়াদিল্লিতে দ্বিতীয় শোরুম চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলা। উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা, যা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে মিশ্র সংকেত দিচ্ছে।
কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়া নেই
রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের এই বয়কট আন্দোলন প্রসঙ্গে ম্যাকডোনাল্ডস, কোকা-কোলা, অ্যামাজন ও অ্যাপল কেউই তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
খবরওয়ালা/এসআই