সৌমিত জয়দ্বীপ
প্রকাশ: 7শে ভাদ্র ১৪৩২ | ২২ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলায় একটা শব্দ আছে, কুম্ভিলক। মানে, যিনি অন্যের লেখা নিজের নামে চালান। এই কাজটিকে বলে কুম্ভিলকবৃত্তি। ইংরেজি শব্দটি বরং অধিকতর জনপ্রিয়—প্লেজিয়ারিজম। বিদ্যায়তনিক কর্মকাণ্ডে কুম্ভিলকবৃত্তিকে চরমতম অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের সংস্কৃতি-রাজনীতির অন্যতম দুই দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শেখ মুজিবুর রহমানকে এই প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা ক্রমাগত করে চলেছে তাদের উত্তরপ্রজন্ম। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে অবশ্য কাজী নজরুলের কথা আসে। আসে গগন হরকরার কথাও। রবীন্দ্রনাথ নাকি নজরুলের কবিতা নিজের নামে চালিয়েছেন, গগনের গান নিজের নামে চালিয়েছেন ইত্যাদি!
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ক্ষণজন্মা লেখক। তাঁদের মধ্যে একটা সাহিত্যিক দ্বন্দ্ব লাগিয়ে দেওয়ার জন্য একটা পক্ষ একজনকে হিন্দুর কবি, আরেকজনকে মুসলমানের কবি পরিচয়ে পরিচিত করতে রীতিমতো সিদ্ধহস্ত। যদিও, রবীন্দ্র-নজরুল কেউই এই প্যাঁচকে প্রশ্রয় দেবেন না বা বেঁচে থাকলে দিতেনও না। কিন্তু, তাতেও কুচক্রী মানুষের মনগড়া গুজবের ফল্গুধারা থামত কি না, সে ব্যাপারটা অনিশ্চিত। যা দিনকাল পড়েছে!
শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ক্ষেত্রেও। কুতর্ক ও বিতর্ক উস্কে দিয়েও, কুচক্রীরা এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না যে, গ্রন্থটির লেখক ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ নন। তিনি হয়তো প্রতিষ্ঠিত লেখক নন, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যা লিখেছেন, তা কয়েক কোটি টাকা কেন, এর দ্বিগুণ টাকা খরচ করেও সেই অভিজ্ঞতা ৫০ বছর পরে লিখে ফেলা সম্ভব নয়।
এমনকি শেখ মুজিবুর রহমানের আদিনাম হিসেবে ‘দেবদাস চক্রবর্তী’ নামক একজন ব্যক্তিকে জুড়ে দিয়েও ব্যাপক মাত্রায় অযাচিত আলাপ তুলেছে উদ্দেশ্যবাদী নেটিজেনদের একটা মন্দ অংশ। শুধু তা-ই নয়, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র প্রচ্ছদের ছবিতে লেখকের নামের স্থলে এই তথাকথিত মিথ্যা-ভুয়া ‘দেবদাস চক্রবর্তী’র নাম বসিয়ে অপপ্রচারও চালিয়েছে এই দুষ্টুচক্রটি। আর এখন তো খোদ তাকে লেখক হিসেবে অস্বীকার করা হচ্ছে হলুদ সাংবাদিকতার অপকৌশলে। যেখানে দাবি করা হচ্ছে, পুলিশের সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীসহ ১২৩ জন মিলে এই বইটি রচনা করেছেন। বিনিময়ে তাদের এক কোটি টাকা ও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় একটি করে ফ্ল্যাট দিয়েছে তৎকালীন আওয়ামী সরকার।
মুখ্যত, জাবেদ পাটোয়ারী কোনো স্বীকৃত লেখক নন। ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগের যে ‘সফট পাওয়ার’ ছিল বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী, তাদের মধ্যে অনেকেই স্বীকৃত লেখক। তখনকার সরকার চাইলে যে কাউকে দিয়েই প্রায় বিনা পয়সায় এই কাজটি করাতে পারত, এতটাই একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিল তাদের। এমনকি বইটির ভূমিকায় যে ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতাপূর্বক নাম উল্লেখ করা হয়েছে—বেবী মওদুদ, এনায়েতুর রহিম, এ. এফ. সালাহ্উদ্দীন আহমদ, শামসুল হুদা হারুন, শামসুজ্জামান খান প্রমুখ—তাদের যে কাউকে এসব হলুদ প্রতিবেদনে ‘লেখক’ বললেও একটা দ্বিধা তৈরি হতো, কেননা তারা প্রত্যেকেই স্বীকৃত লেখক ও গবেষক। কিন্তু, বিস্ময়করভাবে নাম এসেছে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার, যিনি কি না ‘প্রাচীন প্রস্তর যুগে’ (এসবির প্রধান থাকাকালে) খোয়াব দেখেছিলেন একদিন ‘বড় হয়ে’ তিনি এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদাধিকারী হবেন। যুক্তির বলিহারী!
সত্য হলো, জাবেদ পাটোয়ারী শেখ মুজিব সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ-প্রকল্প দলের নেতৃত্বে ছিলেন। সেটি শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা কোনো গ্রন্থ নয়। এর নাম ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন, বাংলাদেশ’। জাবেদ পাটোয়ারী ও ২২/২৩ জনের এই দলটির কাজ ছিল পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবুর রহমান সম্বন্ধে যত গোয়েন্দা প্রতিবেদন ছিল, সেগুলো বাছাই করে সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশযোগ্য করে তোলা, যা বইটির মুখবন্ধেও লেখা আছে। শেখ মুজিবের ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা নয়াচীন’ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস-সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যেমনটা আসলে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ও। এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে পরিকল্পিত গ্রন্থ-প্রকল্পটিও তাই। কিন্তু, এর বিনিময়ে যদি প্রত্যেকজনকে দুই কোটি (নগদ এক কোটি ও ফ্ল্যাট এক কোটি মূল্যমান ধরে) টাকা করে ‘পুরস্কার’ দেওয়া হয়, তা সন্দেহাতীতভাবেই তদন্তযোগ্য অপরাধ। এর বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত করুক। দোষীদের সাজা দিক। কিন্তু, তার সত্যতা যাচাইয়ের অভিপ্রায়ে মূল লেখকের লেখাকে খারিজ করে দেওয়া এক চরম অপরাধ, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি কুরুচিপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
মনে রাখা দরকার, এই গ্রন্থের যখন কাজ শুরু হয়, তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। শেখ হাসিনার লেখা ভূমিকা থেকে জানা যায় যে, ২০০৪ সালের চারটি খাতা হাতে পাওয়ার পর এগুলোকে গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি ধরে কাজ এগোনো হয়। আট বছর পর গ্রন্থটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা প্রকাশনী ইউনিভার্সটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকে প্রকাশিত হয়। ইউপিএলের মতো প্রকাশনী সবকিছু নিশ্চিত না হয়ে এই গ্রন্থ প্রকাশ করেছে বলে যারা মনে করেন, তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন।
এই গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, গ্রন্থটি ‘আওয়ামীকরণে’র দোষে দুষ্টু নয়। শেখ মুজিব যেমন কাল্ট হয়ে উঠেছিলেন, অ্যান্থনি মাসকেরহানসের মতে, ‘দ্য ডেমি গড’, এই গ্রন্থে হাসিনাশাহীর সেই জোরারোপিত ‘দেবতা’র খোঁজ মেলে না। বর্ণনায় একজন সাদামাটা ভূমিপুত্রের তরুণ রাজনীতিক হয়ে ওঠার গল্পটিই উঠে এসেছে। ১৯৪৭ সালের ভারতভাগের ফলে কলকাতা ও দার্জিলিং কী করে পূর্ববাংলার হাতছাড়া হয়ে গেল, সেই কাহিনি আছে এই বইয়ে। কলকাতা হাতছাড়া হওয়ার কাহিনি পাওয়া যায় আবুল মনসুর আহমেদের ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ নামক আত্মজৈবনিক গ্রন্থে। কিন্তু, দার্জিলিং হাতছাড়া হওয়ার বেদনাদায়ক কাহিনি শেখ মুজিব ছাড়া ওই সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী আর কারও গ্রন্থে এত নিটোলভাবে ফুটে ওঠেনি। এই ইতিহাস ১২৩ জনের যৌথ প্রচেষ্টা কেন, ইতিহাসের সাক্ষী না-হওয়া কারও পক্ষেই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়।
তাছাড়া, গল্প ও কল্পকাহিনি টানার ইচ্ছে থাকলে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত নয়, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের পুরো পরিভ্রমণকেই মলাটবন্দি করা সম্ভব ছিল। স্বাধীনতার পর ডিকটেশন দিয়ে আত্মজীবনীর সেই কাজটি শুরুও করেছিলেন তিনি।
এমনকি পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে যারা তার প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিলেন, তাদের প্রশংসিত ভূমিকার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন, যেমন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বা চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী। অথচ, ২০১২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে যা কিছু আওয়ামী বয়ানের বিরুদ্ধে যায়, তার সবকিছুই ফেলে দেওয়ার কথা ছিল কিংবা বয়ান প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংযোজন করার কথা ছিল। সেগুলো কি হয়েছে? বরং অসমাপ্ত রেখেই এটি প্রকাশিত হয়েছে। সেজন্যই এর নামকরণ যথার্থ হয়েছে।
গ্রন্থের ভূমিকা থেকেই স্পষ্ট যে, এর পাণ্ডুলিপি খুবই জরাজীর্ণ ছিল। জরাজীর্ণ পাণ্ডুলিপি পাঠোদ্ধারে প্রয়োজনীয় সম্পাদনা-পরিমার্জনা করা, টীকাভাষ্য লেখা একটি স্বীকৃত সর্বজনীন একাডেমিক পদ্ধতি, যা সম্পাদক বা সম্পাদকমণ্ডলী কর্তৃক সম্পন্ন হয়। ‘চর্যাপদ’ কিংবা ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ আবিষ্কারকরাও সেই পদ্ধতি অবলম্বন করেই পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করেছেন। এখন সেগুলোতে, বিশেষত টীকাভাষ্যে যদি ইতিহাসের কোনো বিচ্যুতি ঘটানো হয়ে থাকে, তাহলে সেই দায় সম্পাদকেরই বটে, লেখকের না।
আবার, বহুজনের আত্মজীবনী যৌথভাবে লেখা হয়েছে, যেখানে আত্মজীবনী যার তিনি ডিকটেশন দিয়েছেন, প্রসিদ্ধ কোনো লেখক নিজের রচনাশৈলী প্রয়োগ করে লিখেছেন (এমন উদাহরণ ভুরিভুরি)। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তা ঘটেনি। তবে, ঘটলেও এর মূল লেখক শেখ মুজিবুর রহমানই থাকতেন। কিন্তু, এই মুজিববিরোধী কাল এমন নির্বোধের মতো ১২৩ জনকে আবিষ্কার করল, যারা যৌথ আত্মজীবনীকার হওয়ারও স্বীকৃত গ্রহণযোগ্যতা পাবেন না।
লেখাটা শেষ করি শেখ মুজিবুর রহমানের একজন প্রবল প্রতিপক্ষ ও সমালোচনাকারীর সূত্র উল্লেখ করে। তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশের অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী, লেখক ও গবেষক বদরুদ্দীন উমর। লেখক ও গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান এ ব্যাপারে আমাদের যোগসূত্র তৈরি করে দিয়েছেন। ফেইসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘আমার ৩/৪ জন বন্ধু (তাঁদের মধ্যে দু-একজন স্বনামখ্যাত, নাম বললে সকলেই চিনবেন, আমি নাম বলতে চাই না) কিছুদিন আগে বেশ আয়োজন করে বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাৎকার নিতে বা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাঁদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, উমর সাহেবের মুখ থেকে এমন একটা কথা বের করা যে মুজিবের নামে প্রকাশিত বইগুলো আসলে তাঁর লেখা নয়, অন্য কেউ লিখেছে। তাঁরা নিজেরা এমনটা বিশ্বাস করেন এবং বরাবর বলে/প্রচার করে আসছেন। তবে উমর সাহেবের মতো একজনের মুখ থেকে এমন একটা কথা বের করতে পারলে তো দারুণ হয়! কিন্তু তাঁদেরকে বেশ হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে। আমি নিশ্চিত সূত্রে জানি, উমর সাহেব তাঁদের উৎসাহে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছেন। এমনিতে সকল বিষয়ে মুজিবের বিরোধী বা তাঁর ব্যাপারে তীব্র সমালোচনা মুখর হলেও, উমর সাহেব তাঁদের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেছিলেন, কমবেশি সম্পাদনা থাকতে পারে (কোন বইয়ের না থাকে?), তবে বইগুলো মুজিবেরই লেখা, তিনি পড়ে বুঝেছেন। অন্য কারো পক্ষে এ কথাগুলো এভাবে লেখা সম্ভব নয়। আমি আমার যে-বন্ধুদের কথা বললাম, তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন সম্পর্কে আমার ধারণা, তিনি মুজিবের একটি বইও পড়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি কখনো। তাঁর ঈমান ওঁকে বলে দিয়েছে, ওগুলো মুজিবের লেখা নয়।’
শেখ মুজিবুর রহমান কোনো কল্পগল্প লিখেননি, তিনি লিখেছিলেন তার অভিজ্ঞতা। কিন্তু, এখনকার বাংলাদেশে তার বিরোধীদের চিন্তাকাঠামোটা ভিন্ন। তারা ঐক্যের কথা বলে মুজিবের সবকিছুকেই খারিজ করে দিতে চান। তাই তারা নিজেদের মতো করে কেচ্ছাকাহিনি নির্মাণ করছেন। নিজেরা না পারলে মিডিয়াকে ব্যবহার করছেন, আগের আমলেও যেমনটা করা হয়েছে। এবার সেই কোপ গিয়ে পড়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মজীবনীতে। কিন্তু, কোপটা জায়গা মতো পড়েনি, কুড়ালের হাতলটাই উল্টো চৌচির হয়ে গেছে!
শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে শতসহস্র সমালোচনা আছে, কিন্তু, যারা এ ধরনের ঘৃণা-প্রকল্প গ্রহণ করে তার বিরুদ্ধে লড়ছেন, তারা মুজিবের পাহাড়সম উচ্চতাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারবেন তো?
খবরওয়ালা/এমএজেড