খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবার এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। দরবারের ভেতরে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে আছে এবং মাঝেমধ্যে আগুনের ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। এটি একনজর দেখতে উৎসুক জনতা ভিড় করছে।
গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত নুরাল পাগলার দরবারে দফায় দফায় হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা শরিয়ত পরিপন্থীভাবে দাফনের অভিযোগ তুলে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়।
উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে আসা একদল লোকের এই হামলায় অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন, যার মধ্যে ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন। এছাড়া পুলিশের দুটি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। হামলায় আহত হয়ে এক ব্যক্তি মারা গেছেন।
পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় গোয়ালন্দ ঘাট থানায় একটি মামলা হয়েছে। শুক্রবার রাতে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিম মোল্লা বাদী হয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলাটি করেন। তবে আজ শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত এ মামলায় কোনো গ্রেপ্তার নেই বলে গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। ওসি আরও জানান, নুরাল পাগলার দরবারে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি।
আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড জুড়ান মোল্লা পাড়ায় অবস্থিত নুরাল পাগলার দরবারের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ রয়েছে। সেখানে উৎসুক জনতা ভিড় করছে। দরবারের ভেতর একটি তিনতলা এবং একটি দুইতলা ভবনের সব কটি কক্ষ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আসবাবপত্র লুটপাট করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট জিনিসপত্র ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভবন থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে নুরাল পাগলার আস্তানা, যেখানে একটি টিনশেড ঘরে তিনি ভক্তদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। তার মৃত্যুর আগে সেখানে একটি বেদি তৈরি করা হয় এবং মৃত্যুর পর তাকে সেখানেই কবর দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দরবারের ভেতর ধ্বংসস্তূপ এবং সেখান থেকে এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। পুলিশ মাঝেমধ্যে উৎসুক জনতাকে সরিয়ে দিচ্ছে।
কুষ্টিয়ার পোড়াদাহ থেকে আসা আবুল হোসেন (৬০) নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘শুক্রবার দেশের আলোচিত খবর ছিল নুরাল পাগলার দরবারে হামলা। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ফেসবুকে খবরটি দেখে আর থাকতে পারলাম না। কী হয়েছে দেখতে রাতে গোয়ালন্দে এক আত্মীয়ের বাড়ি আসি। আজ সকালে দরবারে এসে দেখে গেলাম। তার কাজ বিতর্কিত ছিল, তাই বলে লাশ কবর থেকে তুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি।’ রাজবাড়ীর পাংশা থেকে আসা রত্না বিশ্বাসও বলেন, ‘তিনি অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন বলে আমরা তাকে প্রণাম করতাম। দরবারে হামলার কথা শুনে দেখতে এসেছি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৩ আগস্ট বার্ধক্যের কারণে মারা যান নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলা। ওই দিন রাতে মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে বিশেষ কায়দায় আস্তানায় তার লাশ দাফন করেন ভক্তরা। এরপর স্থানীয় আলেমসহ তৌহিদি জনতা কবরটি সমতল করাসহ কয়েকটি দাবি জানায়। এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা ও উপজেলা ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি এবং নুরাল পাগলার পরিবারের কয়েক দফা বৈঠক হয়। কিন্তু কবর নিচু না করায় ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি দুই দফা সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয়। তারা সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারের মধ্যে কবর সমতল করাসহ বিভিন্ন দাবি জানায়। অন্যথায় শুক্রবার জুমার নামাজের পর গোয়ালন্দ আনসার ক্লাব মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং পরে ‘মার্চ ফর গোয়ালন্দ’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা জালাল উদ্দিন প্রামাণিক এবং সদস্যসচিব বিএনপি নেতা আইয়ুব আলী খান সবাইকে সমাবেশে থাকতে বলেন। কিন্তু উত্তেজিত লোকজন মিছিল নিয়ে নুরাল পাগলার দরবারে হামলা করে। ভেতর থেকে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন নুরাল পাগলার ভক্তরা। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপসহ সংঘর্ষে দুই পক্ষের অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন।
একই সময় কিছু লোক দরবারের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মালামাল লুটপাট করে। একপর্যায়ে বিকেল পাঁচটার দিকে নুরাল পাগলার লাশ কবর থেকে তুলে গোয়ালন্দ পদ্মার মোড়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ওপর নিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
সংঘর্ষে আহত নুরাল পাগলার এক ভক্ত রাসেল মোল্লা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। তিনি গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম তেনাপচা গ্রামের আজাদ মোল্লার ছেলে।
খবরওয়ালা/টিএসএন