আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: 12শে আশ্বিন ১৪৩২ | ২৭ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ফিলিস্তিনে চলমান হামলার কারণে বৈশ্বিক নিন্দা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর ভাষণের সময় বহু দেশের প্রতিনিধি প্রতিবাদ জানিয়ে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে তাঁর বক্তৃতা ঘিরে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের চতুর্থ দিন ছিল শুক্রবার। নেতানিয়াহুর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ওয়াকআউট করেন। অনেকে হাততালি ও শিস বাজিয়ে প্রতিবাদ জানান। পরিষদের সভাপতি শৃঙ্খলা রক্ষার আহ্বান জানালেও তা কার্যকর হয়নি। নেতানিয়াহুর বক্তব্য চলাকালে তাঁর সামনের আসনগুলো শূন্য দেখা যায়। বেশির ভাগ আরব ও মুসলিম দেশ, আফ্রিকার কয়েকটি রাষ্ট্র এবং কিছু ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধি সভা বর্জন করেন।
ভাষণে নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্য, গাজা যুদ্ধ ও ইরানসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এদিকে একই সময়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ ভবনের সামনে ফিলিস্তিনে হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ইসরায়েলি ও ইহুদিরাও জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে আলাদা সমাবেশ করেন।
এবারের অধিবেশনে গাজা সংকটই প্রধান আলোচ্য ছিল। অধিবেশন শুরুর আগেই পশ্চিমা ১০ দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। বক্তব্যে অনেক দেশ ইসরায়েলের নিন্দা জানায়। চিলির প্রেসিডেন্ট গাব্রিয়েল বরিচ নেতানিয়াহুকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) নেওয়ার দাবি জানান। দক্ষিণ আফ্রিকা ইতিমধ্যেই জাতিগত নিধনের অভিযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। সে কারণে ফ্রান্সের আকাশসীমা এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য না হওয়ায় গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নেই।
টাইমস স্কয়ারে আন্দোলনের ঢল: শুক্রবার ভোর থেকে টাইমস স্কয়ারে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। অধিকাংশ ছিলেন তরুণ। হাতে ছিল ফিলিস্তিনি পতাকা, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার—যাতে লেখা ছিল, ‘নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করো’, ‘গাজাকে অভুক্ত রাখা বন্ধ করো’, ‘ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ করো’। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, অধিবেশনে ওয়াকআউটের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভকারীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। পরে প্রায় ২ হাজার মানুষ জাতিসংঘ ভবনের দিকে অগ্রসর হন।
ব্রুকলিনের বাসিন্দা ডেভিড রবিনসন (৬৪) বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের কোনো উদ্বেগ নেই। তাঁদের মানুষ বলেই মনে করা হয় না। এসব হত্যাযজ্ঞ আমাদের হৃদয় ভেঙে দিচ্ছে।’
নেতানিয়াহুর হোটেল ঘিরেও বিক্ষোভ হয়। ইহুদি ও ইসরায়েলি প্রবাসীরা ‘যুদ্ধ বন্ধ করো’, ‘জিম্মিদের মুক্ত করো’ স্লোগান দেন।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য ও সমালোচনা: নেতানিয়াহু গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলার পক্ষে সাফাই দেন। দাবি করেন, জাতিগত নিধনের অভিযোগ মিথ্যা। তবে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন কমিশন জানিয়েছে, ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামাসকে অজুহাত দেখিয়ে নির্বিচার হামলা বৈধতা পেতে পারে না।
তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলার সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের আক্রমণের তুলনা করেন। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া ১০ দেশকেও সমালোচনা করেন। বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১৫৭ দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, গাজায় যুদ্ধ শেষ হয়নি। ইসরায়েলের সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে তিনি দাবি করেন, ‘অনেক নেতা প্রকাশ্যে আমাদের নিন্দা করলেও গোপনে ধন্যবাদ জানান।’
বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া: নেতানিয়াহুর পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বক্তব্যে গাজায় ইসরায়েলি নিপীড়নের নিন্দা জানান। নিহত ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সে যেন আমাদেরই মেয়ে।’ আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন ইসরায়েলকে দায়মুক্তি না দেওয়ার আহ্বান জানান। সেন্ট ভিনসেন্টের প্রধানমন্ত্রী রালফ গনসালভেস বলেন, ‘জাতিগত নিধনে জড়িতদের জন্য নরকের সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান নির্ধারিত।’
পিএলও–র সাবেক কর্মকর্তা জেভিয়ার আবু ইদ মন্তব্য করেন, নেতানিয়াহুর বক্তব্যে বৈশ্বিক জনমত বদলাবে না। তিনি ইতিমধ্যেই একঘরে হয়ে পড়েছেন।
গাজায় নতুন করে হত্যাযজ্ঞ: অধিবেশনের দিনই গাজায় ইসরায়েলি সেনারা নির্বিচার হামলা চালায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ৪৭ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে দুটি শিশু ও ত্রাণ সংগ্রহ করতে যাওয়া ১১ জন রয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, শুধু ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েই এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫০২ জন ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি। হামাসের আক্রমণে ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয় এবং প্রায় আড়াই শ জনকে জিম্মি করা হয়।
গাজা নগরীতে ইসরায়েলি সেনাদের স্থল অভিযান অব্যাহত আছে। স্থানীয় মোহাম্মদ আল-সালোউল বলেন, ‘এই হামলা মানবিকতার সম্পূর্ণ বাইরে। বিশ্ব কী করছে? আমরা মরছি, আর তারা কেবল দেখছে।’
খবরওয়ালা/টিএসএন