খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন ২০২৬
আগামী ১২ আগস্ট ইউরোপ, উত্তর আটলান্টিক এবং আর্কটিক অঞ্চলের আকাশ জুড়ে একটি বিরল ও পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দৃশ্যমান হতে যাচ্ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এটি বর্তমান দশকের অন্যতম সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ মহাজাগতিক ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এই বিরল ও অপরূপ মহাজাগতিক দৃশ্যটি সরাসরি উপভোগ করার জন্য বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এবং মহাকাশপ্রেমী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, যা ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) এই সূর্যগ্রহণের গতিপথ ও ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে একটি বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের পূর্ণ সূর্যগ্রহণের মূল পথটি আর্কটিক অঞ্চল থেকে শুরু হবে। এরপর এটি ক্রমান্বয়ে পূর্ব গ্রিনল্যান্ড, পশ্চিম আইসল্যান্ড এবং স্পেনের একটি বিশাল অংশের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। গ্রহণের এই সুনির্দিষ্ট গতিপথে অবস্থিত অঞ্চলগুলোতে অবস্থানকারীরা কয়েক মিনিটের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হবেন। চাঁদ যখন সূর্যকে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে ফেলবে, তখন স্বাভাবিক দিনের বেলাতেই আচমকা এক নিবিড় অন্ধকার নেমে আসার বিরল দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যাবে।
বিগত ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম ইউরোপের এত বিস্তীর্ণ ও বিশাল ভৌগোলিক এলাকায় পুনরায় কোনো পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। দীর্ঘ সময়ের এই বিরতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমী, বিজ্ঞানী, গবেষক এবং সাধারণ পর্যটকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। মহাজাগতিক হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী, এবারের পূর্ণ সূর্যগ্রহণটি বিশেষ করে স্পেন এবং আইসল্যান্ডের আকাশ থেকে সবচেয়ে স্পষ্ট ও দীর্ঘ সময় ধরে দেখা যাবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
স্পেনের যেসব নির্দিষ্ট শহর ও অঞ্চলে এই পূর্ণ সূর্যগ্রহণটি সবচেয়ে চমৎকারভাবে দৃশ্যমান হবে, সেখানে ইতিমধ্যেই ব্যাপক পর্যটন তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। গ্রহণের দিনটিকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলের হোটেল ও আবাসন কেন্দ্রগুলোতে আগাম বুকিংয়ের এক বিশাল ধুম পড়েছে। স্থানীয় পর্যটন বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বহু হোটেল ও রিসোর্ট ইতিমধ্যেই প্রায় পুরোপুরি ভর্তি হয়ে গিয়েছে। বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যটক, বিজ্ঞানী ও আলোকচিত্রীদের আগমন এবং তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা সামলাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং পর্যটন সংস্থাগুলো বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও জরুরি প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের মূল পথের বাইরেও বিশ্বের একটি বিশাল অংশ জুড়ে আংশিক সূর্যগ্রহণ উপভোগ করা যাবে। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্যমতে, ইউরোপের একটি বড় অংশ, উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার কিছু নির্দিষ্ট অংশ থেকে এই আংশিক সূর্যগ্রহণটি দেখা যাবে।
বিশ্বের যেসব দেশের নাগরিকেরা এই আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পাবেন, তার একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা নিচে উপস্থাপন করা হলো:
ইউরোপীয় অঞ্চল: ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং পর্তুগাল।
উত্তর আফ্রিকান অঞ্চল: মরক্কো, আলজেরিয়া এবং তিউনিসিয়া।
অন্যান্য অঞ্চল: পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার কিছু অংশ।
মহাজাগতিক এই দৃশ্য উপভোগ করার ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা সর্বসাধারণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্যগ্রহণ দেখার সময় সাধারণ সানগ্লাস বা এক্স-রে প্লেট ব্যবহার না করে অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সার্টিফায়েড বিশেষ সূর্যগ্রহণ চশমা (সোলার ফিল্টার যুক্ত চশমা) ব্যবহার করতে হবে। সঠিক নিরাপত্তা চশমা ছাড়া খালি চোখে সরাসরি আংশিক সূর্যের দিকে তাকালে চোখের রেটিনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা স্থায়ী অন্ধত্বের কারণ হিসেবেও দেখা দিতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা এই তথ্যের প্রেক্ষাপট পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সেই সুনির্দিষ্ট ও সংক্ষিপ্ত মুহূর্তটিতে, যখন চাঁদ সূর্যকে শতভাগ বা পুরোপুরি ঢেকে ফেলবে এবং সূর্যের কোনো আলোকরশ্মি সরাসরি আসবে না, কেবল তখনই সাময়িকভাবে খালি চোখে এই দৃশ্যটি দেখা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
১২ আগস্টের এই বিরল পূর্ণ সূর্যগ্রহণের পর পরবর্তী মহাজাগতিক ঘটনার সময়সূচি নিয়েও তথ্য প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। বিজ্ঞানীদের গণনা অনুযায়ী, এই সূর্যগ্রহণের পর আগামী ২০২৭ সালের ২ আগস্ট বিশ্বে আরেকটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ সংঘটিত হবে। সেই পরবর্তী পূর্ণ সূর্যগ্রহণটি মূলত মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি আরব দেশ থেকে সবচেয়ে ভালোভাবে এবং স্পষ্টভাবে দেখা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে এই বছরের ১২ আগস্টের গ্রহণটি ইউরোপের বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।