খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরজব্বর ইউনিয়নের উত্তর চরজব্বর গ্রামের পরিষ্কার বাজারের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অনন্য গল্প। অর্ধশতাব্দী আগে এলাকার সৎ ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি আক্তারুজ্জামান ওরফে ‘পরিষ্কার’-এর নাম অনুসারে বাজারটির নামকরণ করা হয়। তিনি কেবল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, বরং স্থানীয় মানুষের উপকারে নিজের জমি দান করে বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন। আজও তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে চলছে পরিষ্কার বাজার।
গ্রামের চারপাশে সবুজে ঘেরা অঞ্চল। চারটি পাকা সড়ক মিলে গড়ে উঠেছে একটি বাজার, যা পরিচিত পরিচ্ছন্নতা ও স্বচ্ছতার জন্য। পরিষ্কার বাজার নাম শুনলেই কৌতূহল জাগে, এটি সত্যিই কি পরিচ্ছন্ন? কেন এমন নাম পড়ল?
সম্প্রতি আমরা সরেজমিনে গিয়েছিলাম চরজব্বর এলাকায়। বাজার ঘুরে দেখার পর জানা গেছে, রাস্তা-দোকানপাট বেশ পরিচ্ছন্নই রয়েছে। তবে বাজারের নামকরণের পেছনে শুধু পরিচ্ছন্নতা নয়, আছে একটি অনন্য কাহিনি। বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ী আমাদের জানিয়েছেন, এই গল্পের শুরু আজ থেকে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় আগে।
আক্তারুজ্জামান ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা। ব্যক্তিগত জীবনে সব লেনদেন ও আচরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখতেন। যাকে যা কথা দিতেন, সেটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। গ্রামের মানুষ কখনও তাঁকে ‘ওয়াদাবের বরখেলাপকারী’ মনে করতেন না। পোশাক ও ব্যক্তিত্বেও তিনি সব সময় পরিচ্ছন্ন থাকতেন। এসব কারণে গ্রামের মানুষ তাঁকে ‘পরিষ্কার’ নামে ডাকতেন।
সত্তরের দশকে আক্তারুজ্জামান বাড়ির পাশে একটি মুদিপণ্যের দোকান খুলেন। দোকানের চারপাশে গভীর রাত পর্যন্ত এলাকার মানুষজনের আড্ডা চলত। পরে আরও কয়েকটি দোকান গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত দোকানগুলো ঘিরে হাট বসে, যা প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার চলত। গ্রামের মানুষ তাঁর নাম অনুসারে বাজারের নাম দেন পরিষ্কার বাজার। বর্তমানে সরকারিভাবে এই নামই বজায় রয়েছে।
আক্তারুজ্জামানের নাতি কামাল হোসেন, একজন বেসরকারি কলেজের শিক্ষক, বলেন, ‘দাদা ছিলেন অত্যন্ত স্বচ্ছ জীবনযাপনের অধিকারী। সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ছিল তাঁর মূল মাপকাঠি। এজন্য এলাকাবাসী তাঁকে পরিষ্কার নামে ডাকতেন। পরবর্তীতে তাঁর নামেই বাজারের নামকরণ করা হয়। দাদার স্বচ্ছতার কথা শুনলে গর্ব হয়।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বাজার প্রতিষ্ঠার পরও আক্তারুজ্জামান সবকিছুতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতেন। বাজারকে সব সময় পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও তিনিসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীদের। প্রায় দুই দশক আগে ৮০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপরও তাঁর দেখানো পথে বাজার পরিচালনা হচ্ছে।
বাজারের চারপাশ থেকে চারটি সড়ক এসে মিলে গেছে। উত্তর থেকে এসেছে কাঞ্চন বাজার সড়ক, দক্ষিণ থেকে আট কপালিয়া বাজার সড়ক, পশ্চিম থেকে পাঙ্খার বাজার সড়ক এবং পূর্ব থেকে পরিষ্কার বাজার রাস্তার মাথা সড়ক। যদিও কিছু সড়ক ভাঙাচোরা, বাজার এলাকা মোটামুটি ভালো। সড়কের দুই পাশে ৭২টি দোকান রয়েছে। মুদি, মনিহারি, ওষুধ, আসবাবপত্র, কনফেকশনারি, চা ও খাবারের দোকানসহ নানা পণ্য বিক্রি হয়।
মুদিপণ্যের ব্যবসায়ী মো. মোস্তফা (৬৩) বলেন, ‘৩৮ বছর ধরে ব্যবসা করছি। আমার অনেক সহকর্মী মারা গেছেন, শুধু আমি বেঁচে আছি। নতুন ব্যবসায়ীও একসময় আমার ক্রেতা ছিলেন। বাজারের নাম অনুসারে আমরা সবসময় পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি।’
৭০ বছরের বাসিন্দা সানা উল্যাহ বলেন, আক্তারুজ্জামানই বাজারের প্রতিষ্ঠাতা। ব্যবসার চেয়ে মানুষের উপকারে তাঁর মন বেশি ছিল। আশপাশে তখন বাজার ছিল না। এই বাজার প্রতিষ্ঠার ফলে এলাকার মানুষ দূরপথে যাওয়া থেকে মুক্তি পায়।
অন্য বাসিন্দা আবুল খায়ের বলেন, আক্তারুজ্জামান বাজার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি স্কুলের জন্যও নিজের ৪০ শতাংশ জমি দিয়েছেন। এলাকায় কেউ স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে রাজি না হলেও তিনি সুযোগ করে দিয়েছেন। বাজার থাকুক বা না থাকুক, তিনিই মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয়।
খবরওয়ালা/টিএসএন