খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১২ নভেম্বর ২০২৫
চলতি বছরের COP30 জলবায়ু সম্মেলনকে ঘিরে শুরু থেকেই বিতর্ক চলছে। এবার আয়োজক দেশ ব্রাজিলকে কেন্দ্র করে সমালোচনার তাণ্ডব থামছে না। দেশটি যখন পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ঠিক তখনই অ্যামাজনের ১ লাখ গাছ কেটে সম্মেলনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। জানা গেছে, বিদেশি প্রতিনিধিদের চলাচল সহজ করতে চার লেনের একটি মহাসড়ক নির্মাণের সময় এই গাছগুলো কাটা হয়েছে। একদিকে পরিবেশ রক্ষা নিয়ে প্রচারণা, অন্যদিকে বৃক্ষনিধনের মতো কর্মকাণ্ড—এই বৈপরীত্যে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
অ্যামাজন রেইনফরেস্ট, যা “বিশ্বের ফুসফুস” নামেও পরিচিত, প্রতিদিন লোকাল কাঠুরে, খনিজ অনুসন্ধানকারী এবং কৃষকদের লোভের শিকার হয়ে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। বিশাল এই বনভূমির প্রায় ৬০ শতাংশ ব্রাজিলের অংশে পড়ে। বনক্ষয় ও সংরক্ষণ—উভয় ক্ষেত্রেই প্রধান দায়ভার ব্রাজিলের। COP30-এর প্রেক্ষিতে ব্রাজিল সরকার ট্রপিকাল রেইনফরেস্ট ফান্ড (TFFF) নামে ১২৫ বিলিয়ন ডলারের বন সংরক্ষণ তহবিল ঘোষণা করেছে। ইতিমধ্যে নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস এবং পর্তুগালসহ কয়েকটি উন্নত দেশ অর্থ সহায়তা দিয়েছে।
তবে তহবিলের ঘোষণার ঠিক একই সময়ে বন কেটে নতুন মহাসড়ক নির্মাণের খবর এসেছে। নতুন এই ১৩ কিলোমিটার (৮ মাইল) দীর্ঘ সড়কটি বেলেম শহরের কেন্দ্র থেকে সম্মেলন স্থল পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করেছে। এতে ২০০ দেশের প্রায় ৫০ হাজার অতিথি ও প্রতিনিধি সহজে চলাচল করতে পারবেন। ব্রাজিল সরকার দাবি করেছে, সড়কটি “সবুজ ও টেকসই” হবে—এতে সৌরচালিত LED লাইট, ৩০টির বেশি বন্যপ্রাণী পারাপার সেতু, সাইকেল লেন এবং গাছের বেড়া থাকবে।
কিন্তু পরিবেশবিদরা মনে করছেন, এটি কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন নয়। কানাডার জলবায়ু কর্মী মাইক হুডেমা বলেছেন, “যদি আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলবায়ু সমাধানকে কেটে ফেলেন, তবে আপনি জলবায়ুর নেতা হতে পারবেন না।” এক সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, “যদি তারা সত্যিই বিশ্বাস করতেন যে জলবায়ু পরিবর্তন একটি সংকট, তবে তারা পৃথিবীর ফুসুসকে নিজেদের সুবিধার জন্য ধ্বংস করত না।”
এই হাইওয়ে প্রকল্পের প্রস্তাব আসলে প্রায় দশ বছর আগে ব্রাজিলের পারা রাজ্য সরকার দিয়েছিল। তখন পরিবেশবিদরা এটি নিয়ে বিরোধ জানিয়ে বলেছিলেন, “এটি অ্যামাজনের বুকে নতুন ক্ষত তৈরি করবে।” প্রকল্পটি পরে স্থগিত হয়ে যায়। কিন্তু COP30-এর আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হতেই প্রকল্পটি পুনরায় চালু হয়।
ব্রাজিলের পরিবেশ গবেষক লুইসা ফেরেইরা মন্তব্য করেছেন, “এটি এক ধরনের ‘সবুজ ধোঁকাবাজি’। যতই সৌর বাতি লাগানো হোক না কেন, বন কাটা মানেই পরিবেশ ধ্বংস। সম্মেলনের সাফল্য এখন এই বিতর্কের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে।” অ্যামাজন রেইনফরেস্ট পৃথিবীর মোট কার্বন ডাইঅক্সাইডের ৫–১০ শতাংশ শোষণ করে রাখে। তবে অবৈধ বননিধন, কৃষি সম্প্রসারণ এবং খনির প্রকল্পের কারণে বনটি ভয়াবহ চাপে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, যদি মোট বনাঞ্চলের ২০–২৫ শতাংশ হারিয়ে যায়, তবে পুরো বনভূমি সাভানায় রূপ নেবে এবং কোটি কোটি টন কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত করবে।
সামাজিক ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা জোরালো। মার্কিন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, “তারা পরিবেশবাদীদের জন্য রাস্তা বানাতে গিয়ে অ্যামাজনকে ছিঁড়ে ফেলেছে। এটি এক ভয়ানক কেলেঙ্কারি।” ইউরোপ, কানাডা এবং দক্ষিণ আমেরিকার পরিবেশ সংস্থাগুলিও বন সংরক্ষণকে জলবায়ু রক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
উল্লেখ্য, এবারের ৩০তম জলবায়ু সম্মেলন ১০ থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। আলোচ্য বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে ফসিল জ্বালানি নির্ভরতা কমানো, বন সংরক্ষণে অর্থায়ন, জলবায়ু অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সহায়তা, এবং ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা।