খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ইসলামবাগ এলাকার ৫ নম্বর ক্যানেলপাড়ে শুক্রবার সকালটা অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে হঠাৎ ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প মুহূর্তেই ওলটপালট করে দেয় একটি পরিবারের স্বপ্ন–আশা।
৩০ বছর বয়সী কুলসুম বেগম থাকতেন তাঁর বাবার বাড়ির পাশেই একটি ভাড়া বাসায়। স্বামী আবদুল হক কাজের প্রয়োজনে থাকতেন ঢাকার শ্যামবাজারে। দুই মেয়ে—তিন বছরের নুজাইবা জান্নাত এবং ১০ মাসের ফাতেমাকে নিয়ে তাঁর দিন কাটছিল শান্তভাবেই। ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে থাকা বড় মেয়ের কাছে যেতে ফাতেমাকে কোলে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসেন কুলসুম। কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই ঘটে বিপর্যয়: সড়কের পাশের একটি পরিত্যক্ত ও দুর্বল সীমানাপ্রাচীর কেঁপে উঠে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে মা-মেয়ের ওপরে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রাচীর ধসে পড়ার শব্দ ছিল প্রচণ্ড। পথচারীদের চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এসে দেখেন কুলসুম ইটের নিচে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন এবং তাঁর কোলে থাকা শিশু ফাতেমা ঘটনাস্থলেই মারা গেছে। একইসঙ্গে চাপা পড়েন প্রতিবেশী জেসমিন বেগমও। শিশুটির মাথা ইটের আঘাতে থেঁতলে যায়। স্থানীয় কয়েকজন মিলে ইট সরিয়ে ছোট্ট ফাতেমার নিথর দেহ উদ্ধার করেন।
অপরদিকে, গুরুতর আহত কুলসুমকে দ্রুত স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। এ সময় স্বামী আবদুল হক ঢাকায় চিকিৎসার জন্য ছুটতে ছুটতে নিজের সন্তানের দাফনেও অংশ নিতে পারেননি। শিশুটির দাফন সম্পন্ন হয় বিকেলে, মা-বাবাহীন অবস্থায়। হৃদয়বিদারক এই দৃশ্য স্থানীয়দের মন ভারী করে তোলে।
স্বজন ও প্রতিবেশীরা জানান, দাম্পত্য জীবনে অত্যন্ত সাধারণ ও সুখী ছিলেন আবদুল হক ও কুলসুম দম্পতি। মেয়েদের মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর স্বপ্নও ছিল তাঁদের। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের ভূমিকম্প ধ্বংস করে দিল সেই পরিবারটি।
ভূমিকম্পে ধসে পড়া প্রাচীর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম পরিদর্শনে গিয়ে জানান, প্রাচীরটিতে কোনো পিলার ছিল না, রডও ব্যবহার করা হয়নি। প্রায় ১০ ফুট উঁচু সেই দেয়ালটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলেও বলেন তিনি। নিহত শিশুর দাফন খরচে উপজেলা প্রশাসন ২০ হাজার টাকা প্রদান করে।
তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় আহত কুলসুমের চিকিৎসা নিয়ে। রূপগঞ্জ ইউএস–বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাঁকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেলে। সেখানে শয্যা না পেয়ে স্বজনেরা ছুটে যান ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ও নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালে। কোথাও জায়গা না পেয়ে অবশেষে বাধ্য হয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শ্যামবাজারের ভাড়া বাসায়। স্বজনদের অভিযোগ—প্রায় ৯ ঘণ্টা দৌড়ঝাঁপের পরও তাঁরা কোনো সরকারি হাসপাতালে শয্যা পাননি।
কুলসুমের ভগ্নিপতি মোহাম্মদ হোসেন বলেন, “১১ হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দিতে হয়েছে। কুলসুমের মাথায় গুরুতর আঘাত। তিনি ইশারায় কথা বলছেন। একটা বিছানা পর্যন্ত পেলাম না।”
রাত ৯টার দিকে ইউএনও বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক এবং কুলসুমের চিকিৎসা নিশ্চিতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো—কুলসুম এখনো জানেন না যে তাঁর ১০ মাসের মেয়ে ফাতেমা আর বেঁচে নেই।