খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
বড় ভূমিকম্প হলে ধসে পড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার মতো ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছে পুরান ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের বহু ভবন। বিশেষ করে ঢাকার ছয় লাখ ভবনকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁঁকির তালিকায় ধরা হচ্ছে, যার বড় অংশই পুরান ঢাকায় অবস্থিত। পাশাপাশি দেশের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভূকম্পন অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম হলো সিলেট। পার্শ্ববর্তী ডাউকি ফল্ট এবং স্থানীয়ভাবে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পের আওতায় রয়েছে সিলেট জেলা। মাত্র ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই এখানকার পুরোনো ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম নগরীর ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবনের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই বড় ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামনে রিখটার স্কেলে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে রাজধানী। জনসংখ্যার ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিল্ডিং কোড লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ, অপ্রশস্ত সড়ক অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি—এসব কারণে ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
ফলে মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ করলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে—এটাই স্বাভাবিক। তাই এখনই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে এখনো ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে যে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, তা বিপদের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
সিলেট থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ভূমিকম্পে বারবার কেঁপে উঠছে সিলেট। কখনো উৎপত্তিস্থল হচ্ছে ভারতের মেঘালয়ের ডাউকি ফল্টে, আবার কখনো সিলেট বিভাগের ভেতরের বিভিন্ন স্থানে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা স্থানীয় ফল্ট বা চ্যুতিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠায় ভূমিকম্প বাড়ছে। ফলে ভূমিকম্পের ‘ডেঞ্জার জোনে’ থাকা সিলেটে দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত শুক্রবার ঢাকায় যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, সেটি যদি সিলেটে হতো তবে পুরোনো ভবনগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে সিলেটকে দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ ভারতের মেঘালয়ের ডাউকি ফল্ট। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ওই ফল্ট থেকে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পে বৃহত্তর সিলেটের বড় অংশ ধ্বংস হয়েছিল, যা ‘বড় ভুইছাল’ নামে পরিচিত। এরপরও এ ফল্ট থেকে নানা সময়ে ভূমিকম্প হয়েছে, তবে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবুও সক্রিয় থাকা এই ফল্ট বড় ভূমিকম্প ও দুর্যোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২১ সালের মে মাসে ১০ দিনের মধ্যে সিলেটে ২০ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ সময় কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল ডাউকি ফল্টের কাছে, বাকিগুলোর উৎপত্তিস্থল সিলেট বিভাগে। তখন ২২টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম ঢাকার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পকে সিলেটের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ঢাকায় ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ‘মধুপুর ফল্ট লাইন’, যা এত দিন নিষ্ক্রিয় ছিল। এটি সক্রিয় হওয়ায় আশঙ্কা আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, সিলেটে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে পুরোনো ও নন-ইঞ্জিনিয়ারিং ভবনগুলো ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় সিলেটের সক্ষমতা মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। বিশেষ করে সিলেট নগরের উপশহর আবাসিক এলাকা জলাশয় ভরাট করে নির্মিত হয়েছে এবং এখানে হাইরাইজ ভবন বেশি, ফলে বড় ভূমিকম্পে ক্ষতি বেশি হবে।
চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, চট্টগ্রাম নগরে বর্তমানে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবন রয়েছে, যার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে। ৭.৫ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ চট্টগ্রাম দেশের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। এখানে ভবনগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ব্যবস্থা নেই।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) সূত্রে জানা যায়, নগরের ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবনের মধ্যে একতলা ভবন ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি, দুই থেকে পাঁচ তলা ভবন ৯০ হাজার ৪৪৪টি, ৬ থেকে ১০ তলা ১৩ হাজার ১৩৫টি, ১০ তলার ওপরে ৫২৭টি এবং ২০ তলার বেশি ১০টি ভবন আছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক। বড় দুর্যোগে উদ্ধার তৎপরতার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। অধিকাংশ এলাকার গলি এতটাই সরু যে সেখানে উদ্ধারকারী গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স ঢোকা সম্ভব নয়।
২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামে ৬.৯৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ১২টি ভবন হেলে পড়েছিল। ১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্পে পাঁচতলা ভবন ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটে। চউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, চট্টগ্রাম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা; তাই বড় ভূমিকম্প হলে নগরের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভূমিকম্পের তিনটি উৎসই চট্টগ্রামের কাছাকাছি। তাই রিখটার স্কেলে ৭.৫ বা তার বেশি মাত্রায় ভূমিকম্প হলে নগরের ৭৫ শতাংশ ভবন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বন্দর, ইস্টার্ন রিফাইনারি, কক্সবাজার, মাতারবাড়ীসহ বড় স্থাপনাগুলো। তিনি আরও জানান, নগরের অধিকাংশ ভবনই বিল্ডিং কোড মানা ছাড়াই নির্মিত এবং এগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ব্যবস্থা নেই।
খবরওয়ালা/টিএসএন