খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
“একাত্তরের সেই মুক্তিযুদ্ধতে সুফি সম্রাট দেওয়ানবাগী”—গানের এই কলি সামাজিক মাধ্যমে কৌতুকের খোরাক হলেও এর আড়ালে রয়েছে এক অজানা, প্রামাণ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। মাহবুব-এ-খোদা, যিনি পরবর্তীতে দেওয়ানবাগীর পীর হিসেবে পরিচিত হন, একাত্তরে ছিলেন একজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ও প্লাটুন কমান্ডার—এই তথ্য অনেকের অগোচরে রয়ে গেছে।
যখন পাকিস্তানি বাহিনী ধর্মীয় ফতোয়াকে ঢাল বানিয়ে গণহত্যা, ধর্ষণ ও দমননীতিতে লিপ্ত ছিল, শর্ষিণার পীর নারীদের “গনিমতের মাল” ঘোষণা করছিলেন, আর জামায়াত নেতারা বুদ্ধিজীবী হত্যার নকশা আঁকছিলেন—সেই সময়ে দেওয়ানবাগীসহ কিছু আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ান। তারা প্রমাণ করেন—দেশপ্রেম কোনো মতাদর্শের বিরুদ্ধে নয়; বরং ধর্মের শুদ্ধ মূল্যবোধই মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায়।
৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পশ্চিমাঞ্চলের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন তিনি। নির্বাচনের পর পাকিস্তানি শাসকদের ষড়যন্ত্র টের পেয়ে তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেন।
২৫ মার্চের পর শরণার্থী সহায়তায় নেমে পড়লেও দ্রুত বুঝতে পারেন—দেশকে বাঁচাতে হলে সশস্ত্র প্রতিরোধই একমাত্র পথ।
১১ এপ্রিল মেড্ডা ক্যাম্পে যোগদানের পর তাকে তেলিয়াপাড়ায় পাঠানো হয়। সেখানে ৬০ যুবকের একটি প্লাটুনের দায়িত্ব তার হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভারতীয় যুদ্ধ রেকর্ড ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট—দুই জায়গাতেই তার নাম নথিভুক্ত।
২৬ এপ্রিল শাহবাজপুরে পাকিস্তানি অবস্থানে সফল অ্যাটাক তার নেতৃত্বে সম্পন্ন হয়। এরপর একের পর এক অ্যামবুশ—
সিলেট–ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়ক
বাগসাইর
তেলিয়াপাড়া–চুনারুঘাট
মাধবপুর
মনতলা–হরষপুর
প্রতিটি যুদ্ধে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে।
১ নম্বর সেক্টরে পাঠানো হলে তিনি মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে থেকে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কাজে সহযোগিতা করেন।
যুদ্ধ চলাকালীন এম এ জি ওসমানী তাকে কমিশনড অফিসার হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেন—
“আমি যুদ্ধে এসেছি দেশের জন্য, পেশা গড়তে নয়।”
এই কথাটি তার ব্যক্তিত্বের গভীরতা প্রমাণ করে।
বিভিন্ন হোল্ডিং ক্যাম্পে তিনি যোদ্ধাদের মনোবল জাগাতে নিয়মিত ধর্মীয় দিকনির্দেশনা দিতেন। পাকিস্তানিরা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিলেও তিনি বোঝাতেন—শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করাই প্রকৃত ধর্মীয় কর্তব্য।
১৯ নভেম্বর হেজামারা ক্যাম্পে ঈদের খুতবায় তিনি ঘোষণা করেন—“আগামী বকরা ঈদের আগেই দেশ স্বাধীন হবে।”
ধারণা করা হয়, এই বক্তব্য মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অনেক বাড়িয়ে দেয়। এবং অলৌকিকভাবে হলেও, তার কথার সঙ্গে মিল রেখেই দেশ স্বাধীন হয়।
১৯৭২ সালে রেসকোর্স ময়দানে প্রথম ঈদুল আজহার জামাতে ইমামতি করেন তিনিই।
তার তরিকত চর্চা, অনুসারীদের আচরণ বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—একাত্তরের রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন একজন লড়াকু বীর। ট্রলের আড়ালে এই সত্য চাপা পড়া উচিত নয়।
সুফিবাদ শুধু ধ্যান নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি—এই সত্য তিনি অস্ত্র হাতে প্রমাণ করেছেন।