খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 22শে অগ্রহায়ণ ১৪৩২ | ৬ই ডিসেম্বর ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
ভূমি খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতি মোকাবিলায় সরকার এখন বড় ধরনের সংস্কার প্রয়াস শুরু করেছে। ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ছয় ধরনের দলিল সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর বা বাতিল ঘোষণা করা হবে। সরকারের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বহু বছর ধরে চলে আসা জাল দলিল, দ্বৈত মালিকানা, ওয়ারিশ সংক্রান্ত বিরোধ এবং প্রতারণার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা গেছে, যেসব দলিলে জালিয়াতি, প্রতারণা, আইনগত অসঙ্গতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার পাওয়া যাবে, সেগুলো আর বৈধ হিসেবে গণ্য হবে না। অর্থাৎ, দলিল যদি একবার বাতিলের আওতাভুক্ত হয়, তবে সেই দলিল ব্যবহার করে অর্জিত মালিকানাও আইনগতভাবে আর গ্রহণযোগ্য হবে না।
সরকার যে ছয় ধরনের দলিল বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেগুলো হলো—
হেবা দলিল:
অসুস্থ বা অক্ষম ব্যক্তিকে ব্যবহার করে নেওয়া টিপসসহীহযুক্ত, জাল বা প্রতারণামূলকভাবে প্রস্তুতকৃত হেবা দলিল বাতিল হবে। বহু ক্ষেত্রে পরিবারে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে হেবা দলিল নেওয়া হয়—এসবই সরকারের মূল টার্গেট।
ওসিয়তনামা দলিল:
আইন অনুযায়ী একজন ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ ওয়ারিশের বাইরে কাউকে ওসিয়ত করতে পারেন। এই সীমা লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে সেই ওসিয়তনামা দলিল বাতিলের আওতায় আসবে।
রেজিস্ট্রেশনবিহীন দলিল:
রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো সম্পত্তি হস্তান্তরের দাবি করা হলে সেটি আর বৈধ বলে বিবেচিত হবে না। এ ধরনের দলিলই ভূমি বিরোধের সবচেয়ে বড় উৎস।
জাল দলিল:
নকল কাগজপত্র, ভুয়া স্বাক্ষর বা প্রতারণামূলক উপায়ে তৈরি দলিল শনাক্ত করে সেগুলো সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হবে। এ ধরনের দলিল ব্যবহার করে ভূমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্ষমতার অপব্যবহারে অর্জিত দলিল:
রাজনৈতিক প্রভাব, সন্ত্রাসী চক্র বা পেশিশক্তির সহায়তায় জমি আত্মসাৎ বা দখল করলে সেই দলিলও যাচাই-বাছাই শেষে বাতিল হয়ে যাবে।
নিজ অংশের চেয়ে বেশি বিক্রিত দলিল:
পরিবারিক বা যৌথ সম্পত্তিতে কেউ নিজের অংশের চেয়ে বেশি জমি বিক্রি করলে সেই দলিলও অবৈধ ঘোষণা করা হবে। ফলে প্রকৃত ওয়ারিশেরা তাদের সম্পত্তি ফিরে পাবে।
মন্ত্রণালয় জানায়, এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে সারাদেশে চালু হবে ডিজিটাল ভূমিজরি বিডিএস (BDLand System)। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে শুধু যাচাই-প্রমাণিত দলিলই সংরক্ষণ করা হবে। নাগরিকরা ঘরে বসেই অনলাইন মাধ্যমে ভূমি রেকর্ড ও দলিল যাচাই করতে পারবেন।
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মোট মামলা-জটের প্রায় ৬০ শতাংশই ভূমি সংক্রান্ত। জাল দলিল, দ্বৈত মালিকানা ও ওয়ারিশ বিভ্রান্তি এর মূল কারণ। তাই সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে ভূমি খাত আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং জবাবদিহিমূলক হবে।
মন্ত্রণালয় বলছে, এই সংস্কার শুধু দলিল বাতিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দলিল যাচাই, মালিকানা হস্তান্তর, নামজারি, মিউটেশন—সব কিছুই ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হবে।