খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
স্মরণ
“মৃত্যু যদি আসে মাতৃভূমির ডাকে,
সে মৃত্যু ভয় নয়—সে আমার গৌরব।”
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যাঁরা অমরত্ব অর্জন করেছেন, শহীদ আশফাকউল্লাহ খান তাঁদের মধ্যে এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন সেই বিপ্লবী, যাঁর হৃদয়ে ধর্মের ভেদ ছিল না—ছিল শুধু দেশমাতৃকার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিংশ শতাব্দীর প্রথম যে ভারতীয় মুসলিমকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়, তিনি আশফাকউল্লাহ খান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর—কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত জীবনেই তিনি রেখে গেছেন বিস্ময়কর সাহস ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত।
জন্ম ১৯০০ সালের ২২ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরে। পিতা শফিক উল্লাহ খান ছিলেন পাঠান বংশোদ্ভূত, সামরিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক পরিবারের সন্তান। মাতা মাজহুর-উন-নিসা ছিলেন ধর্মপ্রাণ, স্নেহশীলা ও নীতিবান এক নারী। চার ভাইয়ের মধ্যে আশফাক ছিলেন কনিষ্ঠ। বড় ভাই রিয়াসাত উল্লাহ খান ছিলেন বিপ্লবী নেতা পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলের সহপাঠী—এই সূত্রেই একসময় আশফাকের জীবনে প্রবেশ করেন বিসমিল।
প্রথমদিকে বিসমিল আশফাককে গুরুত্ব না দিলেও, ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে শাহজাহানপুরে এক জনসভায় তাঁদের পুনর্মিলন ঘটে। সেদিন থেকেই গড়ে ওঠে এক অনন্য হিন্দু–মুসলিম বিপ্লবী বন্ধন—যা ব্রিটিশ শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
অসহযোগ আন্দোলন দেশজুড়ে স্বাধীনতার আগুন ছড়িয়ে দেয়। বিপ্লবীরা উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু অহিংস আহ্বানে স্বাধীনতা আসবে না। তাই সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ বেছে নেন তাঁরা। অস্ত্র সংগ্রহ ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চালানোর অর্থ জোগাড়ের উদ্দেশ্যে ৮ আগস্ট ১৯২৫ সালে শাহজাহানপুরে এক গোপন বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়—সরনপুর থেকে লক্ষ্ণৌগামী ৮ ডাউন প্যাসেঞ্জার ট্রেনের সরকারি কোষাগার লুট করা হবে।
৯ আগস্ট ১৯২৫, কাকোরী। ইতিহাসের পাতায় রক্তিম অক্ষরে লেখা এক দিন। বিসমিলের নেতৃত্বে আশফাকউল্লাহ খানসহ নয়জন বিপ্লবী সফলভাবে ট্রেন লুট করেন। হতভম্ব ব্রিটিশ সরকার তদন্তে নামায় স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে।
২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২৫ সালে বিসমিলসহ বহু বিপ্লবী গ্রেপ্তার হন। আশফাক পালাতে সক্ষম হলেও বিদেশে গিয়ে বিপ্লবের জন্য অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় এক বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতায়। দিল্লিতে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি।
ফৈজাবাদ জেলে আশফাকের বিরুদ্ধে যে মামলা রুজু হয়, তা ইতিহাসে পরিচিত ‘কাকোরী মামলা’ নামে। মামলায় তাঁর পক্ষে লড়েন প্রখ্যাত আইনজীবী কৃপা শঙ্কর হাজেলা। শাস্তি লাঘবের জন্য পণ্ডিত মোতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস কমিটি গঠন করলেও, রক্তপিপাসু ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কোনো আবেদনেই কর্ণপাত করেনি।
রায় ঘোষণা হয়—মৃত্যুদণ্ড।
আশফাকউল্লাহ খান, পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল, রাজেন্দ্র লাহিড়ী ও ঠাকুর রোশন সিং—চারজনই হাসিমুখে মরণকে বরণ করে নেন।
১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর, সোমবার।
ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয় আশফাকউল্লাহ খানকে। শিকল খুলে দিলে তিনি এগিয়ে যান ফাঁসির দড়ির দিকে। পরম মমতায় দড়িটিকে চুমু খেয়ে বলেন—
“আমার হাত কোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেনি।
আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা।
আল্লাহই আমার প্রকৃত বিচার করবেন।”
এরপর শান্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন কলেমা।
এক মুহূর্তেই নিভে যায় এক তরুণ প্রাণ—কিন্তু জন্ম নেয় এক অমর ইতিহাস।
হিন্দি কবি অগ্নিবেশ শুক্লা তাঁর আবেগঘন কবিতা ‘আশফাক কী আখিরি রাত’-এ যে বেদনাময় মহিমা এঁকেছেন, তা আজও চোখ ভিজিয়ে দেয়। আধুনিক প্রজন্মের কাছে তাঁর আত্মত্যাগ নতুন করে পরিচিত হয় ‘রঙ দে বাসন্তী’ চলচ্চিত্রে—যেখানে কুনাল কাপুর তাঁর চরিত্রে অভিনয় করেন।
শহীদ আশফাকউল্লাহ খান প্রমাণ করে গেছেন
দেশপ্রেমের কোনো ধর্ম নেই,
আর স্বাধীনতার পথে মৃত্যু নিজেই এক মহান উৎসব।
গভীর শ্রদ্ধায় তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র প্রণাম।