খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ঐতিহ্যবাহী আবাসিক হল শেখ মুজিবুর রহমান হলকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামে পুনঃনামকরণ করা হয়েছে। শনিবার গভীর রাতে একদল শিক্ষার্থীর আকস্মিক ও নাটকীয় উদ্যোগে এই নামফলক পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে, যা মুহূর্তেই ক্যাম্পাসজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত প্রায় ১০টার কিছু আগে একদল শিক্ষার্থী হলের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হন। রাতের আঁধারকে কাজে লাগিয়ে একটি ক্রেনের সাহায্যে তারা ফটকের ওপর ওঠেন এবং সেখানে থাকা ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ লেখা সাইনবোর্ডটি খুলে ফেলেন। এরপর সেখানে বড় অক্ষরে লেখা ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামফলক স্থাপন করা হয়। পুরো কার্যক্রম চলাকালে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয় এবং বক্তব্যের মাধ্যমে এর রাজনৈতিক ও প্রতীকী তাৎপর্য তুলে ধরা হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেলেও কোনো ধরনের বড় সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনার পরপরই এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে তীব্র আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আল সাবাহ গণমাধ্যমকে জানান, তাদের উদ্যোগ শুধু নামফলক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, হলের দেয়ালে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রাফিতি বা চিত্রাবলি অপসারণ করে সেখানে শহীদ ওসমান হাদির জীবন ও সংগ্রামভিত্তিক চিত্রকর্ম স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তার ভাষায়, “আমাদের কাছে শহীদ ওসমান হাদি বর্তমান প্রজন্মের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও সাহসের প্রতীক। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা তার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে চাই এবং শিক্ষার্থীদের বর্তমান অনুভূতির প্রতিফলন ঘটাতে চাই।”
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য আবাসিক হলের নামকরণ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ফজিলাতুন্নেছা হলের নাম পরিবর্তনের দাবিও তুলেছে। প্রস্তাবিত নামগুলোর মধ্যে ‘ফেলানী হল’ কিংবা ‘ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম হল’-এর কথা শোনা যাচ্ছে। এসব দাবির সমর্থনে শিক্ষার্থীরা রবিবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের পাঠানো এক বার্তায় এই কর্মসূচির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বার্তায় বলা হয়, হলের নাম পরিবর্তনের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও দাবি-দাওয়ার বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষার্থীরা চান, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও অবকাঠামোর নামকরণে একটি গণতান্ত্রিক, অংশগ্রহণমূলক ও সময়োপযোগী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হোক, যেখানে ইতিহাসের পাশাপাশি সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন থাকবে।
এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তবে শিক্ষক, প্রশাসক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। ঢাবির ইতিহাস, রাজনীতি ও স্মৃতিচর্চা নিয়ে চলমান বিতর্ককে এই ঘটনা আবারও উসকে দিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে অতীতকে কীভাবে স্মরণ করা হবে—এই প্রশ্নটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো গভীরভাবে সংবেদনশীল ও বিতর্কিত।