খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৫ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই একটি অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। বৈদেশিক মুদ্রার জোগান, চলতি হিসাবের ভারসাম্য রক্ষা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালে এই গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন দেশ ডলার সংকট, আমদানি ব্যয়ের চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছিল। ঠিক সেই সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য স্বস্তি এনে দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী পারফরম্যান্স। এই প্রবাহ প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যেও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ সালের রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর উচ্চমাত্রার কেন্দ্রীভবন। মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩৭ শতাংশ এসেছে মাত্র তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড টানা আরেক বছর শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। শরিয়াহভিত্তিক এই বেসরকারি ব্যাংকটি প্রবাসীদের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি করতে পেরেছে বিস্তৃত বিদেশি করেসপন্ডেন্ট নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল রেমিট্যান্স সেবা এবং দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যেও ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) প্রবাসী আয় আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসে, যা মূলত গ্রামীণ অর্থায়নে কেন্দ্রীভূত একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অগ্রণী ব্যাংক তৃতীয় স্থানে নেমে গেলেও এখনও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের প্রবাসী আয় চ্যানেল করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৬ দশমিক ২০৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক পেয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১২৭ বিলিয়ন ডলার এবং অগ্রণী ব্যাংক পেয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৭৮২ বিলিয়ন ডলার। এই তিন ব্যাংক মিলেই মোট রেমিট্যান্সের ৩৬ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিচালনা করেছে, যা ব্যাংকিং খাতে তাদের প্রভাবের পরিমাণ স্পষ্ট করে।
২০২৫ সালে শীর্ষ রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত ব্যাংকসমূহ
| ব্যাংকের নাম | রেমিট্যান্স (বিলিয়ন ডলার) |
|---|---|
| ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ | ৬.২০ |
| বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক | ৩.১৩ |
| অগ্রণী ব্যাংক | ২.৭৮ |
| জনতা ব্যাংক | ২.২৬ |
| ব্র্যাক ব্যাংক | ২.১৭ |
| ট্রাস্ট ব্যাংক | ১.৮২ |
| সোনালী ব্যাংক | ১.৫১ |
| রূপালী ব্যাংক | ১.২২ |
| সিটি ব্যাংক | ০.৯৫ |
| ব্যাংক এশিয়া | ০.৮৫ |
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর নীতিগত ও প্রশাসনিক কিছু পরিবর্তন রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। অবৈধ হুন্ডি দমন, বাজারভিত্তিক তুলনামূলক স্থিতিশীল বিনিময় হার, সরকারের ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা এবং ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মধ্যে সমন্বয় জোরদার হওয়ায় প্রবাসীরা আরও বেশি করে বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করতে উৎসাহিত হয়েছেন।
এই ইতিবাচক প্রবণতার সর্বোচ্চ প্রকাশ দেখা যায় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে, যখন এক মাসেই রেকর্ড ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। বছরের শেষ দিকেও ধারা অব্যাহত থাকে এবং ডিসেম্বর মাসে প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে বছরের শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহনশীলতা ও ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।