খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি ২০২৬
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কনকনে শীতের রাতে রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া সেই দুই ভাইবোনের গল্পটি শেষ পর্যন্ত বিষাদে রূপ নিল। জীবন-মৃত্যুর দীর্ঘ লড়াইয়ে হার মেনে না ফেরার দেশে চলে গেছে দুই বছর বয়সী শিশু মোরশেদ। সোমবার (৫ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। তীব্র শীত, অবহেলা এবং নিউমোনিয়ার প্রাবল্য শিশুটির কোমল শরীর আর সহ্য করতে পারেনি। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি পুরো চট্টগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ছায়া ফেলেছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পিএবি সড়কের নির্জন পাশ থেকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় শিশু দুটিকে উদ্ধার করেছিলেন মহিম নামের একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক। অভিভাবকহীন শিশু দুটির অসহায়ত্বের খবর ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রাম জেলা ও উপজেলা প্রশাসন তাদের সুচিকিৎসা ও দেখাশোনার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে। মোরশেদ ও তার চার বছর বয়সী বোনকে উদ্ধারের পর থেকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে স্বপ্নযাত্রী ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক এবং জেলা প্রশাসনের বিশেষ তত্ত্বাবধানে তাদের চিকিৎসা চলছিল। তবে দুর্ভাগ্যবশত মোরশেদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
নিচে শিশু উদ্ধার ও বর্তমান পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত সারণি তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| উদ্ধারকৃত শিশু | মোরশেদ (০২) ও তার চার বছর বয়সী বড় বোন |
| উদ্ধারের তারিখ ও স্থান | ২৮ ডিসেম্বর রাত, পিএবি সড়ক, আনোয়ারা |
| উদ্ধারের প্রেক্ষাপট | তীব্র শীতে রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় |
| বর্তমান অবস্থা (মোরশেদ) | ৫ জানুয়ারি দুপুরে চমেক হাসপাতালে মৃত্যু |
| পারিবারিক পরিচয় | পিতা: খোরশেদ আলম, গ্রাম: মহামনি, মানিকছড়ি |
| বর্তমান অবস্থান (পিতা) | পারিবারিক কলহের দায়ে জেলহাজতে |
| বর্তমান অবস্থান (মাতা) | এখনও নিখোঁজ, সন্ধানে পুলিশ |
শিশু মোরশেদের দাদি পারভীন আক্তার হাসপাতালে নাতির মরদেহের পাশে বসে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তিনি জানান, তাদের আদি নিবাস খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলার মহামনি এলাকায়। পারিবারিক কলহ ও অভাবের জেরে শিশু দুটিকে রাস্তায় ফেলে যাওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। গত বুধবার রাতে পুলিশ বাঁশখালী এলাকা থেকে শিশুদের বাবা খোরশেদ আলমকে আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পারিবারিক অশান্তির কথা স্বীকার করেছেন, যার ফলে তাকে বর্তমানে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, শিশুদের মা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং পুলিশ তার সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার এই মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, শিশু মোরশেদের মরদেহ তার নিজ গ্রাম মানিকছড়িতে দাফনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বেঁচে থাকা অন্য শিশুটির (মোরশেদের বোন) ভবিষ্যতের ব্যাপারে তিনি বলেন, যদি তার দাদি তাকে লালন-পালনের সামর্থ্য রাখেন তবে তাকে দেওয়া হবে, অন্যথায় শিশুটির নিরাপত্তা ও যত্নের কথা বিবেচনা করে প্রশাসন আইনগতভাবে বিকল্প সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। একটি সাজানো সংসার কীভাবে পারিবারিক দ্বন্দ্বে তছনছ হয়ে যায় এবং নিষ্পাপ শিশুরা এর বলি হয়, মোরশেদের মৃত্যু যেন তারই এক মর্মান্তিক দলিল হয়ে রইল।