খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 25শে পৌষ ১৪৩২ | ৮ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আলী আরদেস্তানি নামের এক ইরানি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে তেহরান। বুধবার (৭ জানুয়ারি, ২০২৬) দেশটির বিচার বিভাগীয় বার্তা সংস্থা ‘মিজান নিউজ’ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। আরদেস্তানির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি ইরানের অতি সংবেদনশীল এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার গোপন নথিপত্র, স্থিরচিত্র ও ভিডিও মোসাদকে সরবরাহ করেছেন।
অভিযোগ ও বিচারিক প্রক্রিয়া
ইরানের বিচার বিভাগের ভাষ্যমতে, আলী আরদেস্তানি দীর্ঘ সময় ধরে মোসাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। এই কাজের বিনিময়ে তিনি সরাসরি নগদ অর্থের পরিবর্তে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন, যাতে লেনদেনের কোনো ডিজিটাল প্রমাণ বা পদচিহ্ন না থাকে। দীর্ঘ আইনি শুনানি ও তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের পর দেশটির আদালত তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। বুধবার ভোরে দেশটির একটি কারাগারে এই দণ্ড কার্যকর করা হয়।
নিচে ইরানে গুপ্তচরবৃত্তি ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সংক্রান্ত সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি সারণি দেওয়া হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ ও তথ্য |
|---|---|
| দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি | আলী আরদেস্তানি (ইরানি নাগরিক) |
| প্রধান অভিযোগ | মোসাদকে কৌশলগত স্থাপনার ছবি ও ভিডিও সরবরাহ। |
| পারিশ্রমিক মাধ্যম | ক্রিপ্টোকারেন্সি (ডিজিটাল মুদ্রা)। |
| সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট | গত বছরের জুনে ইসরায়েল-ইরান ১২ দিনের যুদ্ধ। |
| নিরাপত্তা অবস্থান | যুদ্ধের পর পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার। |
| মানবাধিকার উদ্বেগ | গত ১ বছরে প্রায় ১,৫০০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর (চীনের পরেই অবস্থান)। |
| বর্তমান বিক্ষোভ | ২৮ ডিসেম্বর থেকে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে চলমান গণবিক্ষোভ। |
যুদ্ধ-পরবর্তী কঠোর নিরাপত্তা ও মানবাধিকার প্রশ্ন
গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সাথে ইরানের ১২ দিনের বিধ্বংসী যুদ্ধের পর থেকেই তেহরান তাদের গোয়েন্দা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অভেদ্য করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ওই যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছিলেন। এরপর থেকে তেহরান ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে, যার ফলে গত ছয় মাসে ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অন্তত ১২ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।
তবে এই বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নরওয়ে-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআর)। সংস্থাটির পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম দাবি করেছেন, আরদেস্তানির স্বীকারোক্তি জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছে এবং এর কোনো আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতা নেই। তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভ থেকে সাধারণ মানুষের মনোযোগ সরাতেই সরকার এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বিক্ষোভ ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভের মাঝে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি বিশ্লেষকদের কাছে ভিন্ন তাৎপর্য বহন করছে। ধারণা করা হচ্ছে, সরকার এই কঠোর বার্তা দিয়ে জনগণের মাঝে এক ধরনের ভীতি সঞ্চার করতে চাইছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তাদের ফার্সি ভাষার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ইরানের আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানিয়ে পোস্ট দিচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, অনেক সময় প্রকৃত অপরাধীদের বদলে নির্দোষ ব্যক্তিদের ফাঁসানো হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে কঠোর হাতে দমন করা হবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ এবং পাল্টাপাল্টি গোয়েন্দা তৎপরতা এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।