খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তির এক মহাবিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। আসন্ন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল প্রতিরূপ বা ‘থ্রি-ডি অবতার’ তৈরি করার ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি। এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি’ -কে আরও নির্ভুল এবং বিতর্কহীন করা। লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত ‘কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক শো’ -তে দেওয়া এক বক্তব্যে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই যুগান্তকারী উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
প্রযুক্তির কার্যপদ্ধতি ও ডিজিটাল অবতার
২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৪৮টি দলের প্রতিটিতে ২৬ জন করে খেলোয়াড় থাকবেন। অর্থাৎ মোট ১,২৪৮ জন ফুটবলারকে এই ডিজিটাল স্ক্যানিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। টুর্নামেন্টের আগের প্রথাগত ফটোশুটের সময়ই খেলোয়াড়দের একটি বিশেষ চেম্বারে বসানো হবে। মাত্র এক সেকেন্ডের এই স্ক্যানিং প্রক্রিয়ায় খেলোয়াড়ের শরীরের হাড়ের গঠন, পেশির মাপ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুক্ষ্ম সব পরিমাপ ডিজিটাল ডেটা হিসেবে সংরক্ষিত হবে। ফিফা জানিয়েছে, একবার এই স্ক্যান সম্পন্ন হলে দ্রুত গতির দৌড় বা বল দখলের লড়াইয়ের সময়ও এআই প্রযুক্তি খেলোয়াড়দের নির্ভুলভাবে ট্র্যাক করতে পারবে।
নিচে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রস্তাবিত প্রযুক্তি প্যাকেজের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:
| প্রযুক্তির নাম | মূল কাজ ও উদ্দেশ্য | ডেটা ট্র্যাকিং ক্ষমতা |
|---|---|---|
| থ্রি-ডি ডিজিটাল অবতার | প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঠিক শারীরিক কাঠামো তৈরি। | ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ডেটা। |
| সেমি-অটোমেটেড অফসাইড | স্বয়ংক্রিয়ভাবে অফসাইড শনাক্ত করা। | প্রতি খেলোয়াড়ের জন্য ১০,০০০ ডেটা পয়েন্ট। |
| রিয়েল-টাইম থ্রি-ডি রিক্রিয়েশন | দৃষ্টিসীমা ভিত্তিক অফসাইড নির্ণয়। | ভিএআর রেফারির সিদ্ধান্ত দ্রুত করা। |
| বল ট্র্যাকিং সেন্সর | বল মাঠের বাইরে গেছে কি না তা নির্ধারণ। | রিয়েল-টাইম গ্রাফিক্যাল আউটপুট। |
কেন এই প্রযুক্তির প্রয়োজন?
বর্তমানে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগসহ বিভিন্ন বড় টুর্নামেন্টে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে ৩০টি হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা ব্যবহার করে একজন খেলোয়াড়ের শরীরের প্রায় ১০ হাজার ডেটা পয়েন্ট ট্র্যাক করা হয়। তবে সমস্যা হলো, বর্তমান সিস্টেমে যে গ্রাফিক্যাল মডেল বা কঙ্কাল সদৃশ ছবি ব্যবহার করা হয়, তা অনেক সময় খেলোয়াড়ের প্রকৃত শারীরিক গঠনের সাথে মেলে না। সম্প্রতি প্রিমিয়ার লিগে নিউক্যাসল বনাম ম্যানচেস্টার সিটি ম্যাচে রুবেন দিয়াজের একটি অফসাইড গ্রাফিকস নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, যা টেলিভিশন ফুটেজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফিফা আশা করছে, খেলোয়াড়দের নিজস্ব শরীরের মাপ ব্যবহার করে তৈরি করা ‘অবতার’ এই ধরনের বিভ্রান্তি দূর করবে।
মাঠে এই প্রযুক্তির পরীক্ষা
এই প্রযুক্তিটি ইতিমধ্যেই ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপের ম্যাচে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফ্ল্যামেঙ্গো ও পিরামিডস এফসির মধ্যকার ম্যাচে খেলোয়াড়দের আগেভাগেই স্ক্যান করা হয়েছিল, যা অফসাইড সিদ্ধান্তে নজিরবিহীন স্বচ্ছতা এনেছে। এছাড়া ফিফা ‘লাইন অব সাইট’ ভিত্তিক অফসাইড (যখন একজন খেলোয়াড় গোলরক্ষকের দৃষ্টিসীমায় বাধা হয়ে দাঁড়ান) নির্ণয় করতে রিয়েল-টাইম থ্রি-ডি রিক্রিয়েশন প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়েছে।
জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠেয় ১০৪ ম্যাচের এই আসরকে ‘এই গ্রহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সর্বকালের সেরা আয়োজন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রযুক্তির এই সংমিশ্রণ ফুটবলারদের গতিবিধিকে যেমন সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করবে, তেমনি রেফারির ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ম্যাচ হেরে যাওয়ার আক্ষেপও কমিয়ে আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।