খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি মাঠে থাকায় কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বিএনপি। বুধবার (২১ জানুয়ারি, ২০২৬) রাতে দলের পক্ষ থেকে এক জরুরি বিবৃতিতে জানানো হয় যে, শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ৫৯ জন নেতাকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্বাচনের প্রাক্কালে মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্বে এক বড় ধরনের রদবদল ও ওলটপালট লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দলীয় নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলের হাইকমান্ড থেকে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও যেসব নেতা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন এবং প্রত্যাহার করেননি, তাঁদের বিরুদ্ধেই এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ। এর আগে প্রথম দফায় আরও বেশ কিছু নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, যার ধারাবাহিকতায় এবার ৫৯ জনের তালিকা প্রকাশ করা হলো।
বহিষ্কৃত নেতাদের তালিকায় দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদের নেতারা রয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগে বহিষ্কারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বহিষ্কৃতদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য, উপদেষ্টা এবং জেলা সাধারণ সম্পাদকের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতারাও রয়েছেন।
বিভাগ ভিত্তিক বহিষ্কৃত শীর্ষ নেতাদের তালিকা (সংক্ষিপ্ত):
| বিভাগ | উল্লেখযোগ্য বহিষ্কৃত নেতা ও পদবি | নির্বাচনি আসন |
| ঢাকা | লুৎফর রহমান খান আজাদ (উপদেষ্টা), অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম (নির্বাহী সদস্য) | টাঙ্গাইল-৩, নারায়ণগঞ্জ-৩ |
| রাজশাহী | তাইফুল ইসলাম টিপু (সহ-দপ্তর সম্পাদক), কে এম আনোয়ারুল ইসলাম (নির্বাহী সদস্য) | নাটোর-১, পাবনা-৩ |
| চট্টগ্রাম | প্রকৌশলী ফজলুল আজীম (সাবেক এমপি), কাজী মফিজুর রহমান (নির্বাহী সদস্য) | নোয়াখালী-৬, নোয়াখালী-২ |
| ময়মনসিংহ | এবি সিদ্দিকুর রহমান (যুগ্ম আহ্বায়ক), শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল (নির্বাহী সদস্য) | ময়মনসিংহ-১০, কিশোরগঞ্জ-৫ |
| রংপুর | এ জেড এম রেজওয়ানুল হক (নির্বাহী সদস্য) | দিনাজপুর-৫ |
| খুলনা | মনিরুল ইসলাম (সাধারণ সম্পাদক), ডা. শহীদুল আলম (নির্বাহী সদস্য) | নড়াইল-২, সাতক্ষীরা-৩ |
| সিলেট | শেখ সুজাত মিয়া (নির্বাহী সদস্য), মামুনুর রশীদ (উপদেষ্টা) | হবিগঞ্জ-১, সিলেট-৫ |
নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে এমন গণ-বহিষ্কারের ঘটনা তৃণমূল বিএনপিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে দল কঠোর হাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে অনেক প্রভাবশালী নেতা দলছুট হওয়ায় সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে দলীয় প্রার্থীরা বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বহিষ্কৃত নেতারা স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রাখায় ভোটের লড়াই এখন ‘দলীয় বনাম বিদ্রোহী’ ইমেজে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে টাঙ্গাইল-৩ আসনের লুৎফর রহমান খান আজাদ এবং নোয়াখালী-৬ আসনের ফজলুল আজীমের মতো প্রার্থীদের বহিষ্কার রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, দল এখন একক নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থেকে নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায়। কোনো ধরনের বিভাজন বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল সহ্য করা হবে না। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর আগে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, যাঁরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে দলের সাথে বেইমানি করবেন, তাঁদের দলে ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আজকের এই আদেশ সেই হুঁশিয়ারিরই বাস্তব প্রতিফলন।
বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কারের মাধ্যমে বিএনপি নির্বাচনী লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থানকে নিষ্কণ্টক করতে চাইছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এই বহিষ্কৃত নেতারা তাঁদের অনুসারীদের নিয়ে কেমন প্রভাব বিস্তার করেন, তা দেখার জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দলের এই কঠোর সিদ্ধান্ত নির্বাচনী ফলাফলে ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়।