খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের এক বর্বরোচিত ও নৃশংস পরিণতি প্রত্যক্ষ করল এলাকাবাসী। মাত্র তিন বছর বয়সী এক শিশুকে আছাড় দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। বুধবার (২১ জানুয়ারি, ২০২৬) দুপুরে উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাপাহাড় এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। নিহত শিশুর নাম নূর আবদুল্লাহ, সে ওই গ্রামের নুরুল আলম রাসেলের একমাত্র পুত্র। এই ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসার পাশাপাশি জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত শিশুর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেশী দ্বীন ইসলামের পরিবারের সঙ্গে নুরুল আলমের পরিবারের বসতবাড়ির সীমানা ও ঘর নির্মাণ নিয়ে প্রায় ১৫ বছর ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধ নিরসনে ইতিপূর্বে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি। পরবর্তীতে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। নুরুল আলমের পরিবার বিজ্ঞ আদালতে মামলা দায়ের করলে ওই বিতর্কিত জমিতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের ওপর আদালত স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (ইঞ্জাংশন) জারি করেন।
নিহত শিশুর বাবা নুরুল আলম জানান, আদালতের সুষ্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বুধবার বেলা ১১টার দিকে দ্বীন ইসলাম ও তাঁর ভাই আরিফুল ইসলাম বিরোধপূর্ণ জায়গায় ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এ সময় নুরুল আলমের মা ও স্ত্রী বাধা দিতে গেলে বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে প্রতিপক্ষ দ্বীন ইসলাম ও তাঁর লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে আক্রমণ করেন। উত্তেজনার চরম পর্যায়ে ঘাতক দ্বীন ইসলাম পাশে থাকা অবুঝ শিশু নূর আবদুল্লাহকে জাপটে ধরে সজোরে মাটিতে আছাড় মারেন। মুমূর্ষু অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে দ্রুত মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য:
| ক্যাটাগরি | বিস্তারিত তথ্য |
| নিহত শিশু | নূর আবদুল্লাহ (৩ বছর), পিতা- নুরুল আলম রাসেল। |
| ঘটনাস্থল | দক্ষিণ সোনাপাহাড়, জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন, মিরসরাই। |
| বিরোধের কারণ | বসতবাড়ির জমি ও ঘর নির্মাণ সংক্রান্ত ১৫ বছরের বিবাদ। |
| আইনি অবস্থা | বিরোধপূর্ণ জায়গায় আদালতের স্থিতাবস্থা (নিষেধাজ্ঞা) ছিল। |
| প্রধান অভিযুক্ত | দ্বীন ইসলাম ও তাঁর ভাই আরিফুল ইসলাম (বর্তমানে পলাতক)। |
| পুলিশি অ্যাকশন | জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ জন আটক; মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। |
নিহতের দাদি জ্যোৎস্না আরা বেগম আহাজারি করে বলেন, “তারা আমার ছেলের বউ রূপা আক্তারকে মারধর করছিল। নাতনিটা সামনে ছিল বলে তাকে জানোয়ারের মতো আছাড় দিল। আমাদের দীর্ঘদিনের কষ্টের ফসল এই মাসুম বাচ্চাটাকে ওরা মেরে ফেলল।” শিশুটির মা রূপা আক্তার সন্তানের শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। পুরো পরিবার এখন ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবি জানাচ্ছেন।
ঘটনার পর পরই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী নাজমুল হক জানান, খবর পাওয়ার পর পুলিশ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে। তবে প্রধান অভিযুক্ত দ্বীন ইসলাম ও তাঁর ভাই আরিফুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। শিশুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে।
সামান্য এক টুকরো জমির জন্য একটি নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে যাওয়া আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ। আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা, পুলিশ দ্রুত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবে এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই শিশু হত্যার সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত করবে।