খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির সাথে সঙ্গতি রেখে জাতীয় বেতন কমিশন একটি যুগান্তকারী প্রতিবেদন দাখিল করতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত এই কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করেছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি, ২০২৬) কমিশনের প্রধান ও সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান এই প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান ২০১৫ সালের বেতন স্কেলে ২০টি গ্রেড বা ধাপ বিদ্যমান রয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোতেও এই ২০টি ধাপ অপরিবর্তিত রাখা হলেও বেতনের অংকে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যাবে। বর্তমানে ২০তম গ্রেডে একজন কর্মচারীর মূল বেতন মাত্র ৮ হাজার ২৫০ টাকা, যা নতুন সুপারিশে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত হচ্ছে। একইভাবে নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত ও বর্তমান বেতন কাঠামোর তুলনামূলক চিত্র:
| গ্রেড/পদবি | বর্তমান মূল বেতন (২০১৫ স্কেল) | প্রস্তাবিত মূল বেতন (২০২৬ সুপারিশ) | প্রবৃদ্ধির হার (প্রায়) |
| ২০তম গ্রেড (সর্বনিম্ন) | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা | ১৪২% |
| ৯ম গ্রেড (১ম শ্রেণি) | ২২,০০০ টাকা | ৪০,০০০ – ৪২,০০০ টাকা | ৯০% |
| সচিব (১ম গ্রেড) | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৫০,০০০ টাকা | ৯২% |
| মন্ত্রিপরিষদ সচিব | ৮৬,০০০ টাকা | ১,৬০,০০০ টাকা | ৮৬% |
কেবল মূল বেতনই নয়, সরকারি কর্মচারীদের জন্য অন্যান্য ভাতাদিও আকর্ষণীয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা প্রদান করা হয়, যা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া যাতায়াত ভাতার পরিধি বাড়িয়ে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে, যা আগে কেবল ১১তম গ্রেড থেকে শুরু হতো। ঢাকায় কর্মরত একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন ২০ হাজার টাকা হলেও বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতা মিলিয়ে মাসিক মোট বেতন দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪২ হাজার টাকা।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এই বেতন কমিশন অত্যন্ত মানবিক ও ইতিবাচক সুপারিশ করেছে। যারা বর্তমানে স্বল্প পরিমাণ পেনশন পান, তাদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার হবে আকাশচুম্বী। সুপারিশ অনুযায়ী পেনশনের হার নিম্নরূপভাবে বৃদ্ধি পাবে:
২০ হাজার টাকার কম পেনশন: ১০০% বৃদ্ধি (দ্বিগুণ)।
২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা: ৭৫% বৃদ্ধি।
৪০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে: ৫৫% বৃদ্ধি।
গত ২৪ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে এই পে কমিশন গঠন করে। ছয় মাসের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই কমিশন তাদের কাজ সম্পন্ন করেছে। দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি চাকুরিজীবী এই নতুন স্কেলের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই বিশালাকার আর্থিক সংশ্লিষ্টতাসম্পন্ন স্কেলটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করে যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে কিছুটা সংশয় রয়েছে। কারণ, এই বেতন কাঠামো কার্যকর করতে হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিশাল অংকের অতিরিক্ত বাজেটের প্রয়োজন হবে।
জাতীয় বেতন কমিশনের এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পাবে এবং জীবনযাত্রার সংকট অনেকাংশে লাঘব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পে কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, তারা দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও কর্মচারীদের প্রয়োজনের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করে এই সেরা প্রস্তাবটি পেশ করছেন। এখন বল সরকারের কোর্টে; দেখার বিষয় কবে নাগাদ এই প্রস্তাব আলোর মুখ দেখে।