খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে নিরাপত্তাজনিত সতর্কতার কারণ দেখিয়ে ভারত এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনসহ বাংলাদেশে অবস্থিত অন্যান্য মিশনগুলোর কার্যক্রম পূর্বের ন্যায় সচল থাকবে বলে জানানো হয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা পিটিআই এবং বিবিসি হিন্দির প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
বিবিসি হিন্দির এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে এখন ‘নন-ফ্যামিলি’ বা ‘পরিবার-বহির্ভূত’ দেশ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে। এর ফলে কূটনীতিকদের নিরাপত্তার মানদণ্ডে বাংলাদেশকে এখন পাকিস্তান, আফগানিস্তান কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের কাতারে রাখা হয়েছে। দীর্ঘ চার দশকের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ও নেতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এক নজরে ভারতের সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও অবস্থান |
| গৃহীত সিদ্ধান্ত | ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাবাসন। |
| কারণ (ভারতের দাবি) | নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা ও নির্বাচনকালীন ঝুঁকি। |
| নতুন শ্রেণীবিন্যাস | বাংলাদেশকে ‘পরিবার-বহির্ভূত’ (Non-family) রাষ্ট্র ঘোষণা। |
| পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ভাষ্য | ভারতের এই আচরণকে ‘অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত। |
| নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ | ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। |
| দ্বিপাক্ষিক প্রভাব | সম্পর্কের ভাঙন রোধে উভয় পক্ষের সদিচ্ছা প্রয়োজন। |
ভারতের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন গভীর বিস্ময় ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিবিসি হিন্দিকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে—এমন কোনো নজির বা প্রমাণ নেই।
বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সমপর্যায়ে রাখা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, “ভারত যদি বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সমান স্তরে নামিয়ে আনে, তবে সেটি একান্তই তাদের সিদ্ধান্ত। বিষয়টি অবশ্যই অত্যন্ত দুঃখজনক, তবে তাদের এই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা আমাদের নেই।” তিনি আরও যোগ করেন যে, গত ৪০ বছর ধরে ভারতের সাথে বিভিন্ন কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর মনে হচ্ছে, ভারত সরকার বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ‘অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া’ (Overreaction) দেখাচ্ছে। তিনি ভারতের কাছ থেকে আরও পরিণত ও দূরদর্শী আচরণ প্রত্যাশা করেছিলেন।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে মো. তৌহিদ হোসেন সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “আমরা যদি প্রকৃত অর্থেই ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক চাই, তবে প্রথমে উভয় পক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমরা সত্যিই তা চাই কিনা। যদি একপক্ষ নিয়মিত এমন পদক্ষেপ নিতে থাকে যা সম্পর্কের ভীতকে নড়বড়ে করে দেয়, তবে চূড়ান্তভাবে সম্পর্কের ভাঙন অবধারিত।”
নির্বাচনকালীন উত্তাপকে কেন্দ্র করে দিল্লির এই কঠোর অবস্থান ঢাকার সাথে সম্পর্কের শীতলতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের পরিবার সরিয়ে নেওয়া হলেও কনস্যুলার ও ভিসা সার্ভিস আগের মতোই চালু রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক।
দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এই সিদ্ধান্তটি বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা দেওয়া হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব, যা পালনে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এমতাবস্থায় ভারতের এই নেতিবাচক শ্রেণীবিন্যাস কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতিই ঘটাবে না, বরং তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।