খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে মাঘ ১৪৩২ | ২৬ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে একটি বহুতল ভবন থেকে রড পড়ে মো. আশফাকুজ্জামান চৌধুরী (৩৫) নামের এক ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় আবাসন খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কনকর্ড গ্রুপের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে কনকর্ড গ্রুপ এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে যে, রডটি তাদের ভবন থেকে নয় বরং পাশের অন্য একটি ভবন থেকে পড়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে গুলশান এলাকায় চাঞ্চল্য এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্মাণ নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি, ২০২৬) দুপুরে গুলশান-১ নম্বরের ১৪০ নম্বর সড়কের ২২ নম্বর বাড়ির সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আশফাকুজ্জামান চৌধুরী একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন এবং তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। ঘটনার দিন দুপুর আনুমানিক পৌনে তিনটার দিকে উপর থেকে একটি রড তাঁর মাথায় ঢুকে যায়। সহকর্মীরা তাঁকে দ্রুত ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনায় পরদিন শুক্রবার নিহতের শ্বশুর মো. সিরাজুল ইসলাম তালুকদার বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় কনকর্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এম কামাল উদ্দিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার কামালসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। বাদীর অভিযোগ, এটি একটি চরম পর্যায়ের দায়িত্ব অবহেলা এবং অপরাধমূলক গাফিলতি।
ঘটনা ও মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
| তথ্যের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| নিহত ব্যক্তি | মো. আশফাকুজ্জামান চৌধুরী (৩৫)। |
| পেশা ও কর্মস্থল | বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। |
| প্রধান আসামি | এস এম কামাল উদ্দিন (চেয়ারম্যান) ও শাহরিয়ার কামাল (এমডি)। |
| অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান | আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘কনকর্ড গ্রুপ’। |
| ঘটনাস্থল | ১৪০ নম্বর সড়ক, গুলশান-১। |
| মামলার ধারা | অপরাধমূলক অবহেলা ও গাফিলতিজনিত মৃত্যু। |
| নিরাপত্তা ব্যবস্থা | নির্মাণাধীন ভবনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাবের অভিযোগ। |
মামলায় কনকর্ডের নির্মাণাধীন ‘২৫তম কনকর্ড এমবিআই স্কাইলাইন’ ভবন থেকে রড পড়ার কথা বলা হলেও প্রতিষ্ঠানটি এক লিখিত বিবৃতিতে তা অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, রডটি পড়েছে বিপরীত দিকের ‘ক্রিস্টাল প্লেস’ ভবন থেকে। কনকর্ড জানায়, ঘটনার সময় ক্রিস্টাল প্লেস ভবনের কাচ পরিষ্কারের কাজ চলছিল এবং সেখানে ঝুলা প্ল্যাটফর্মে স্টিলের রড রাখা ছিল। অসতর্কভাবে কাজ করার সময় একটি রড নিচে পড়ে যায়।
কনকর্ড গ্রুপ আরও দাবি করেছে যে, ঘটনার পরপরই কাচ পরিষ্কারকারী কর্মীরা দ্রুত তাঁদের প্ল্যাটফর্ম সরিয়ে ফেলেন। ক্রিস্টাল প্লেসের ছাদে এখনো বেশ কিছু স্টিল রড পড়ে আছে এবং এসব ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও ভিজ্যুয়াল প্রমাণ তাঁদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। স্থানীয়দের মতেও, নিহত ব্যক্তি যে স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার ঠিক পাশেই ক্রিস্টাল প্লেস ভবন, আর রাস্তা পার হয়ে অন্য পাশে কনকর্ডের নির্মাণাধীন ভবনটি।
আজ দুপুরে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার রওনক আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, উভয় ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। যেহেতু দুটি ভবনই কাছাকাছি অবস্থিত, তাই রডটি ঠিক কোন উচ্চতা এবং কোন দিক থেকে পড়েছে তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য করতে নারাজ পুলিশ প্রশাসন।
রাজধানীর আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা জালি বা বেষ্টনী ব্যবহার না করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একটি মূল্যবান প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর দায় নিয়ে যে টানাহেঁচড়া চলছে, তা সাধারণ পথচারীদের জীবনের নিরাপত্তাকে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এটি কনকর্ডের গাফিলতি নাকি পাশের ভবনের অব্যবস্থাপনা—তা নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে বের করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করাই এখন সময়ের দাবি।