খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও ৯ মাস বয়সী দুগ্ধপোষ্য সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যুর চার দিন পর অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতা জুয়েল হাসান (সাদ্দাম)। আজ বুধবার দুপুর দুইটার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি জামিনে মুক্ত হন। সিনিয়র জেল সুপার আসিফ উদ্দীন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তাঁর এই মুক্তিকে কেন্দ্র করে কারাফটকে এক ধরণের রহস্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
জুয়েল হাসান সাদ্দাম বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ২৩ জানুয়ারি তাঁর বাড়িতে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। পুলিশ তাঁর স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালির ঝুলন্ত মরদেহ এবং পাশেই তাঁদের ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসানের নিথর দেহ উদ্ধার করে। সেই সময় সাদ্দাম যশোর কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২৪ জানুয়ারি পরিবারের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হলেও তা মঞ্জুর করা হয়নি।
ফলে এক চরম অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বজনরা নিরুপায় হয়ে স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে বাগেরহাট থেকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নিয়ে আসেন। কারা কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতিতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মাত্র ৫ মিনিটের জন্য সাদ্দামকে তাঁর প্রিয়জনদের শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই হাতকড়া পরা অবস্থায় নিথর স্ত্রী-সন্তানকে দেখে তাঁর কান্নার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের এপ্রিলে গোপালগঞ্জ থেকে সাদ্দামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন কারাগারে বন্দি ছিলেন। নিচে তাঁর গ্রেপ্তার ও মুক্তির একটি সংক্ষিপ্ত কালানুক্রম তুলে ধরা হলো:
| তারিখ ও সময় | ঘটনার বিবরণ |
| এপ্রিল, ২০২৫ | গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন জুয়েল হাসান সাদ্দাম। |
| ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫ | বাগেরহাট কারাগার থেকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর। |
| ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ | নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও ৯ মাস বয়সী সন্তানের মরদেহ উদ্ধার। |
| ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ | কারাফটকে মাত্র ৫ মিনিটের জন্য স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখার সুযোগ। |
| ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ | উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) থেকে ৬ মাসের জামিন লাভ। |
| ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ | দুপুর ২টায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে চূড়ান্ত মুক্তি। |
সাদ্দামের মুক্তিকে কেন্দ্র করে আজ দুপুরের পর থেকে যশোর কারাফটকে গণমাধ্যমকর্মীরা অপেক্ষা করতে থাকেন। তবে কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো পরিষ্কার তথ্য দেওয়া হয়নি। সাংবাদিকদের বারবার এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনায় সেখানে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যায় কারাগারের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আসিফ উদ্দীন জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুপুরে সাদ্দামকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে কারাধ্যক্ষ আবিদ আহম্মেদ সাংবাদিকদের ফোন রিসিভ না করায় কর্তৃপক্ষের এই লুকোচুরির কারণ অস্পষ্টই থেকে যায়।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সাদ্দাম সরাসরি তাঁর গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের সাবেকডাঙ্গায় পৌঁছান। সেখানে পৌঁছেই তিনি স্ত্রী ও সন্তানের কবর জিয়ারত করেন। সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। কবরের পাশে সাদ্দামের কান্নায় ওই এলাকায় এক শোকাতুর ও ভারী পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগের এই নেতা বর্তমানে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন, তবে তাঁর পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই অপূরণীয় ক্ষতি পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে।