খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
হবিগঞ্জের প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকায় নারীরা সংসার এবং পরিবারের দায়িত্বের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, অনলাইন উদ্যোগ, কৃষি ও গুচ্ছ উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ শুধু নিজস্ব জীবিকা নয়, বরং জেলার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নারীরা বিভিন্ন খাতে যুক্ত হচ্ছেন—ব্যবসা, চাকরি, প্রবাসী আয়, এসএমই উদ্যোগ, কৃষি ও সেবা খাত।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, হবিগঞ্জের মোট জনসংখ্যা ২৩,৫৮,৮৮৬। এর মধ্যে নারী সংখ্যা ১২,১৪,৪২৯, যা অর্ধেকের বেশি। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা প্রায় ৪২ শতাংশ।
হবিগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ চা উৎপাদন অঞ্চল। ২৩টি চা-বাগান থেকে দেশের মোট চা উৎপাদনের ২২ শতাংশ আসে। চা উৎপাদনে শ্রমিকদের ৬০–৭০ শতাংশই নারী।
নালুয়া চা-বাগানের মিতা রানী ত্রিপুরা (৪৫) গত এক দশকে নিজেকে ও সহকর্মীদের মধ্যে অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একসময় তার দৈনিক চা-পাতার উৎপাদন ছিল ২০–২২ কেজি; বর্তমানে তা ৪০–৪৫ কেজি। মিতার আয় দিয়ে দুই সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন এবং স্বামীকে ছোট ব্যবসা শুরু করতে সহায়তা করেছেন।
হবিগঞ্জে নারীদের প্রায় ২৬ শতাংশ কৃষিকাজে যুক্ত। ধান, সবজি, ফুল ও হর্টিকালচারাল ফসল চাষ, বীজতলা তৈরি, ধান মাড়াই—নারীরা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
উদাহরণস্বরূপ, মিন্নি আক্তার সদর উপজেলার রিচি গ্রামের কৃষক। হোমস্টেড পদ্ধতিতে হাঁস-মুরগি, মাছ চাষ ও সবজি চাষ মিলিয়ে তিনি পরিবারের আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় মহিলাদের প্রশিক্ষণও দিচ্ছেন।
শায়েস্তাগঞ্জে অবস্থিত প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রায় ১২,০০০ নারী কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে অনেকে বিধবা, বিচ্ছিন্ন বা পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম। অনেকেই অপারেটর, লাইন ইনচার্জ বা সুপারভাইজার পদে উন্নীত হয়েছেন।
চুনারুঘাটের মণি মুন্ডা (২৮) পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। অসুস্থ বাবার দেখাশোনা করছেন এবং দুই বোনের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার খরচ চালাচ্ছেন। তিনি স্থানীয় নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।
দুধপাতিল গ্রামে প্রায় ৩০০ নারী মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। এটি গ্রামের ঘরবাড়ি, জমি, শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। রুনা খাতুন প্রবাসে কাজ করে ১২ লাখ টাকায় জমি ক্রয় করেছেন, বাড়ি বানিয়েছেন এবং স্বামীকে সহযোগিতা করেছেন।
নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প, এনজিও সহায়তা এবং এসএমই ঋণের মাধ্যমে পারভীন আক্তার প্রাথমিক সেলাই মেশিন দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমান ব্যবসার পুঁজি ২০ লাখ টাকা এবং তিনি ১৫–২০ নারী কর্মীকে কর্মসংস্থান দিয়েছেন।
| খাত | নারীর সংখ্যা / অংশগ্রহণ | উল্লেখযোগ্য উদাহরণ |
|---|---|---|
| চা-বাগান শ্রমিক | ৬০–৭০% | মিতা রানী ত্রিপুরা |
| কৃষি | ২৬% | মিন্নি আক্তার |
| শিল্প-কারখানা | ১২,০০০ নারী | মণি মুন্ডা |
| প্রবাসী কর্মী | ~৩০০ নারী | রুনা খাতুন |
| ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা | ১৫–২০ কর্মী | পারভীন আক্তার |
হবিগঞ্জের নারীরা বিভিন্ন খাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজ জীবন, পরিবারের অর্থনীতি ও স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সম্ভব।