খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আইনজ্ঞ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত
মতিলাল নেহরু ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম প্রখ্যাত আইনজীবী, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর দিকের একজন সক্রিয় পথিকৃৎ। তিনি শুধু একজন সফল আইনজ্ঞই নন, বরং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।
তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর পিতা। তবে পিতৃপরিচয়ের বাইরেও মতিলাল নেহরু নিজ গুণে ও কর্মে ভারতীয় ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র ও সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
মতিলাল নেহরু জন্মগ্রহণ করেন ৬ মে ১৮৬১ সালে, উত্তর প্রদেশের আগ্রা শহরে। তাঁর পিতার নাম গঙ্গাধর নেহরু। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত প্রথম প্রজন্মের ভারতীয়দের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তিনি এলাহাবাদের মিউর সেন্ট্রাল কলেজে অধ্যয়ন করেন, যদিও সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেননি। পরবর্তীতে তিনি ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘বার এট ল’ ডিগ্রি লাভ করেন এবং দেশে ফিরে ব্রিটিশ শাসনাধীন আদালতে একজন সফল আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এলাহাবাদে তাঁর খ্যাতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য।
রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯১৯–১৯২০ এবং ১৯২৮–১৯২৯—এই দুই মেয়াদে তিনি ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস আরও সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠে।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে কংগ্রেস থেকে পৃথক হয়ে তিনি ‘স্বরাজ পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন, যার লক্ষ্য ছিল আইনসভায় প্রবেশ করে ব্রিটিশ শাসনের ভিতরে থেকেই স্বশাসনের দাবি জোরালো করা।
১৯২৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস কনভেনশনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। একই বছরে কংগ্রেস কর্তৃক গঠিত ভারতীয় সংবিধান কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পান তিনি। এই কমিশনের প্রণীত ঐতিহাসিক দলিলই ‘নেহরু রিপোর্ট’, যা ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করে।
পারিবারিক জীবনে মতিলাল নেহরু ছিলেন স্ত্রী রূপো রানীর সঙ্গে এক সম্ভ্রান্ত ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারের কর্তা। তাঁদের একমাত্র পুত্র জওহরলাল নেহরু এবং দুই কন্যা—বিজয়লক্ষ্মী ও কৃষ্ণ। বড় কন্যা বিজয়লক্ষ্মী পরবর্তীকালে ‘বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত’ নামে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি অর্জন করেন। ছোট কন্যা কৃষ্ণ পরবর্তীতে ‘কৃষ্ণ হট্টীসিংহ’ নামে পরিচিত হন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
এলাহাবাদে তিনি একটি দৃষ্টিনন্দন ও ঐতিহাসিক ভবন নির্মাণ করেন, যার নাম দেন ‘আনন্দ ভবন’। পরবর্তীতে তিনি তাঁর পুরনো বাড়ি ‘স্বরাজ ভবন’ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে দান করেন—যা আজও স্বাধীনতা আন্দোলনের এক জীবন্ত স্মারক।
১৯৩১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এলাহাবাদে এই মহান দেশপ্রেমিক পরলোকগমন করেন। মতিলাল নেহরুর জীবন ছিল শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।