খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
গাইবান্ধা শহরের একটি নামী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালিত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে নিষ্ঠুরভাবে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী যুবকের নাম মুর্শিদ হক্কানী (৩৭)। এই অমানবিক ঘটনার প্রতিকার চেয়ে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তার বড় ভাই আওরঙ্গ হক্কানী বাদী হয়ে গাইবান্ধা সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযুক্তরা হলেন ওই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মুর্শিদ হক্কানী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। তার উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আশায় গত বছরের ২৮ আগস্ট গাইবান্ধা শহরের ভি-এইড রোডে অবস্থিত ‘গণ উন্নয়ন কেন্দ্র’ (জিইউকে) পরিচালিত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে তাকে ভর্তি করা হয়। ভর্তির শুরুর দিকে পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত খোঁজখবর নিতে দেওয়া হলেও ধীরে ধীরে কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে স্বজনদের সাথে মুর্শিদের দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেয়।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে স্বজনরা পুনরায় মুর্শিদের সাথে দেখা করতে চাইলে দায়িত্বরত ব্যক্তিরা অসংলগ্ন আচরণ শুরু করেন। দীর্ঘ বাকবিতণ্ডার পর বিকেল তিনটার দিকে তাকে দেখার অনুমতি দেওয়া হয় এবং জানানো হয় যে তারা আর তাকে কেন্দ্রে রাখবেন না। এসময় মুর্শিদের সারা শরীরে জখমের চিহ্ন দেখে স্বজনরা আঁতকে ওঠেন।
কেন্দ্রের পাওনা পরিশোধ করে মুর্শিদকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি সেখানে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা দেন। মুর্শিদের ভাষ্যমতে, একটি আধা পাকা ঘরে নিয়ে তার মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে লোহার রড দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হতো। নির্যাতনের ধরন ছিল মধ্যযুগীয় কায়দার। নিচে একটি সারণির মাধ্যমে নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরা হলো:
| শরীরের অঙ্গ | আঘাতের ধরন ও মাধ্যম |
| হাত ও পা | লোহার রড দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত এবং হাড়ের সন্ধিস্থলে জখম। |
| পিঠ ও ঊরু | রড ও লাঠির আঘাতে রক্ত জমাট বেঁধে কালচে দাগ। |
| নাক ও মুখ | নাকে ধারালো কিছুর আঘাত এবং মুখে কাপড় গুঁজে শ্বাসরোধের চেষ্টা। |
| পদ্ধতি | দুই পা রশি দিয়ে বেঁধে উল্টো করে জানালার গ্রিলে ঝুলিয়ে রাখা। |
| মানসিক অবস্থা | জ্ঞান হারানো পর্যন্ত মারধর এবং পরিবারকে না জানাতে হুমকি প্রদান। |
লিখিত অভিযোগে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঁচজনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন— বাঁধন (৩৫), লাবিব (৩২), সিয়াম (৩৫), আতিক (৩৬) ও তালহা (৩৫)। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মুর্শিদকে ১১ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর বড় ভাই আওরঙ্গ হক্কানী বলেন, “আমরা চিকিৎসার জন্য তাকে দিয়েছিলাম, নির্যাতনের জন্য নয়। আমি এই অমানুষিক অপরাধের সুষ্ঠু বিচার চাই।”
গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে, গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) প্রধান নির্বাহী এম আবদুস সালাম বিষয়টি অবগত হয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রগুলোতে এমন নির্যাতনের ঘটনা জনমনে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যথাযথ তদারকির অভাবে নিরাময়কেন্দ্রগুলো এখন টর্চার সেলে পরিণত হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।