খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১ এপ্রিল ২০২৪
খবরওয়ালা ডেস্ক ॥ মার্চ শেষেও আইএমএফের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের জন্য বেশকিছু মানদন্ড লক্ষ্যমাত্রা ও মাপকাঠি পূরণের পাশাপাশি সংস্কারের শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদন্ড নিট বৈদেশিক রিজার্ভ (এনআইআর)। এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ নাজুক। লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রিজার্ভ সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি এখন পর্যন্ত। এমনকি সংস্থাটির সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকেও এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সুদহার ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার না হওয়ার কারণেই দেশের রিজার্ভ বাড়ছে না।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি অনুসারে, কোয়ান্টিটেটিভ পারফরম্যান্স ক্রাইটেরিয়া (কিউপিসি) বা পরিমাণগত সক্ষমতার মানদন্ড, ইন্ডিকেটিভ টার্গেটস (আইটি) বা নির্দেশক লক্ষ্য ও স্ট্রাকচারাল বেঞ্চমার্ক (এসবি) বা কাঠামোগত মাপকাঠি পূরণের শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে এনআইআর কিউপিসির অন্তর্ভুক্ত। আইএমএফ গত বছরের মার্চ প্রান্তিকে রিজার্ভ সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছিল ২২ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের। যদিও বাংলাদেশ সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয় ১৯ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের নিট রিজার্ভ। এর পরের প্রান্তিক অর্থাৎ গত বছরের জুন শেষে ২৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে নিট রিজার্ভ ছিল ১৯ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।

এদিকে আইএমএফের পর্ষদে বাংলাদেশকে দেয়া ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড় অনুমোদন হয় গত বছরের ডিসেম্বরে। ওই সময় এনআইআরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারায় ছাড় চেয়েছিল বাংলাদেশ, যা অনুমোদনও করে সংস্থাটি। তখন নিট রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে পুনর্র্নিধারণ করে দেয়া হয়। সে অনুযায়ী গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে রিজার্ভ সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন, যা আগে ছিল ২৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। একইভাবে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ২৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ সংরক্ষণের শর্ত থাকলেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রায় তা কমে ১৭ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
তার পরও আলোচ্য এ দুই প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। আইএমএফের লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে, চালতি বছরের মার্চ শেষে ১৯ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ও জুন শেষে ২০ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারের নিট রিজার্ভ সংরক্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, আইএমএফের ব্যালান্স অব পেমেন্টস ও ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম৬) পদ্ধতি অনুসারে ২৭ মার্চ শেষে দেশের গ্রস বৈদেশিক রিজার্ভ (জিআইআর) ছিল ১৯ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
আইএমএফের হিসাব অনুসারে নিট রিজার্ভ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে জিআইআর থেকে রিজার্ভ সম্পর্কিত দায় বাদ দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে আইএমএফ থেকে নেয়া এসডিআর বরাদ্দ ও সংস্থাটির কাছে থাকা বাংলাদেশের এক বছরের কম মেয়াদের অনাদায়ী দায় এবং অন্যান্য বিদেশী মুদ্রার দায়, রূপান্তরযোগ্য মুদ্রায় অনিবাসীদের দায়, আকু, জাপান ডেবট রিলিফ গ্র্যান্ট (জেডিআরজি) ও বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাবে থাকা দায়।
ফরোয়ার্ড কন্ট্রাক্টস, বিদেশী মুদ্রায় সোয়াপ ও অন্যান্য ফিউচার মার্কেটের কন্ট্রাক্টস সংক্রান্ত দায়ও এক্ষেত্রে বাদ যাবে। সাধারণত বাংলাদেশের গ্রস রিজার্ভ ও নিট রিজার্ভের মধ্যে ৪-৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান থাকে। যেমন গত বছরের জুন শেষে বাংলাদেশের জিআইআর ও এনআইআরের মধ্যে ৪ বিলিয়ন এবং গত বছরের অক্টোবর শেষে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান ছিল। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে যদিও দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। কিন্তু আমরা তো বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের সংস্কার করিনি।
ডলারের দর নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা এখনো বাফেদা-এবিবির মডেল থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি। তাছাড়া এ দরেও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। এর চেয়ে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। ডলারের আনুষ্ঠানিক যে দর ১১০ টাকা, এ দরে লেনদেন হচ্ছে খুব কম। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার কেনা ও আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রেই শুধু তা কার্যকর। অন্যদিকে কার্ব মার্কেটের বাইরেও একটি অনানুষ্ঠানিক ডলারের বাজার গড়ে উঠেছে। বিদেশে যাদের এজেন্ট আছে এবং সুনজরে আছে তাদের জন্য এটি একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ করে দিয়েছে। সবাই মিলে যে ডলারের ব্যবসা করবে সে সুযোগ বেশ সীমিত। ফলে সত্যিকার প্রতিযোগিতামূলক বাজার হলে যে পরিমাণ ডলার এখানে আসত সেটি আসছে না।’

আইএমএফের রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে ডলার বিক্রি বন্ধ করে বাজার থেকে কিনতে হবে উল্লেখ করে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, তা না হলে রিজার্ভ বাড়বে কীভাবে? আবার সোয়াপের মাধ্যমে ডলার নিলে সেটি আইএমএফের হিসাবে নিট রিজার্ভ থেকে বাদ পড়ে যাবে। সোয়াপের বাইরে অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু ডলার কিনেছে, যদিও বিক্রি করেছে তার চেয়ে বেশি। সমস্যা কেটে গেছে, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্বস্তি নেইকোনো কোনো পদস্থ কর্মকর্তাকে এমনটা বলতে দেখা যায় উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এটি বাস্তবতার নিরিখে সঠিক বর্ণনা নয়। কিছুটা উন্নতি হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই, মানে অস্বস্তি কিছুটা কমেছে।
তবে সেটি এমন পর্যায়ে যায়নি যে বাংলাদেশ ব্যাংককে আর ডলার বিক্রি করতে হবে না। তাছাড়া রেমিট্যান্স এমন পরিমাণে বাড়েনি যে ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত ডলার আছে। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনতে চাইছেন না, বরং বিক্রি করতে আগ্রহী। বর্তমানে বাংলাদেশের নিট রিজার্ভ কত জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের সাবেক এ অর্থনীতিবিদ বলেন, আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুসারে আমাদের যে পরিমাণ গ্রস রিজার্ভ রয়েছে তা থেকে স্বল্পমেয়াদি দায় বাদ দিলে যা থাকবে সেটিই নিট রিজার্ভ। এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি দায় ৪-৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে থাকে। সে হিসেবে আমার অনুমান এ মুহূর্তে আমাদের নিট রিজার্ভ ১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে সুদহার বৃদ্ধি ও বিনিময় হার স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংস্কার প্রয়োজন হলেও এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, এ বিবেচনায় তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে সুদহারে হাত দেয়া হয়নি। তবে গত আট মাসে ব্যাংক ঋণের সুদহার ৪ দশমিক ১১ শতাংশ বাড়ানো হলেও এটি পর্যাপ্ত নয়। দেশে গত দুই বছর ডলারের বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতা চলছে। এ সময়ে মার্কিন মুদ্রাটির বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। চলতি বছরের জুনের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল করতে ‘ক্রলিং পেগ’ নীতি অনুসরণের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিভিন্ন দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, অর্থনৈতিক সংকটের মুহূর্তে এ নীতি অনুসরণ করে কোনো দেশই এখন পর্যন্ত সাফল্য পায়নি, বরং তা প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনাই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আইএমএফের সাবেক অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সবকিছুর মূলে হচ্ছে সুদহার।
এটি আরো বাড়িয়ে টাকাকে মূল্যবান করতে হবে। তাহলে ডলার ভাঙিয়ে টাকায় রূপান্তরের প্রবণতা বাড়বে। বর্তমানে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এটি প্রকৃত রেমিট্যান্স, নাকি দেশের বাইরে যে অর্থ পাচার হয়েছিল সেটিই রেমিট্যান্স আকারে বৈধ অর্থ হিসেবে দেশে ঢুকছে তা দেখার বিষয়। মুদ্রা বিনিময় হারকে স্থিতিশীল করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিনিময় হার স্থিতিশীল হলে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে। এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। আর এটি করতে গেলে সুদহার বাড়ানোর বিকল্প নেই।
আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের সভায় গত বছরের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সাত কিস্তিতে ৪২ মাসে এ ঋণ পাবে বাংলাদেশ। ঋণের গড় সুদহার ২ দশমিক ২ শতাংশ। ৪৭০ কোটি ডলারের মধ্যে দুই ধরনের ঋণ রয়েছে। বর্ধিত ঋণসহায়তা বা বর্ধিত তহবিল (ইসিএফ অ্যান্ড ইএফএফ) থেকে পাওয়া যাবে ৩৩০ কোটি ডলার। রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির (আরএসএফ) আওতায় মিলবে ১৪০ কোটি ডলার। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ ঋণ কর্মসূচি চলাকালীন বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের শর্ত পরিপালন ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।
গত বছরের ফেব্র“য়ারিতে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণের প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার বুঝে পেয়েছে বাংলাদেশ। ওই বছরের ডিসেম্বরে পাওয়া যায় ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। তবে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ও শর্ত পরিপূরণ এবং সংস্কার বাস্তবায়ন মূল্যায়ন করে আগামী মে মাসে তৃতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ের কথা রয়েছে। এজন্য আগামী এপ্রিলের শেষের দিকে আইএমএফের একটি রিভিউ মিশন বাংলাদেশে আসবে। পরবর্তী কিস্তির অর্থ পাওয়ার বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রিজার্ভ বাদে আইএমএফের বাকি প্রায় সব শর্তই যেহেতু পূরণ হয়েছে সেহেতু মনে হয় না যে কিস্তির টাকা আটকে থাকবে। তবে সংস্থাটির শর্তে যা-ই থাকুক না কেন এ মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল ও স্পর্শকাতর দিক হচ্ছে রিজার্ভ। তাই আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এটিকে বাড়াতে হবে।
আরও দেখুন: