খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলায় হত্যা, চাঁদাবাজি ও দস্যুতাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে শাহ জামাল মিয়া (৪৫) নামে এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত আলগার চর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। শাহ জামাল মিয়া দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে দুটি জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক পরোয়ানা বিদ্যমান ছিল।
গ্রেপ্তারকৃত শাহ জামাল মিয়া গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য। তিনি ওই ইউনিয়নের ডাকাতিয়ার চর গ্রামের মৃত আব্দুল হামিদ সরকারের পুত্র। জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুবাদে এলাকায় তার প্রভাব থাকলেও পর্দার আড়ালে তিনি বিভিন্ন অপরাধমূলক সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফুলছড়ি থানা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শাহ জামাল মিয়ার বিরুদ্ধে গাইবান্ধা ও পার্শ্ববর্তী জামালপুর জেলায় অন্তত আটটি গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা এবং গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানায় চাঁদাবাজি, দস্যুতা ও মারপিটসহ আরও সাতটি মামলা অন্তর্ভুক্ত। এসব মামলার অধিকাংশতেই তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকলেও তিনি চর অঞ্চলের ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আসছিলেন।
ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুরুল হোদা সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, শাহ জামাল মিয়াকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে সজাগ ছিল। তিনি চরাঞ্চলের দুর্গম এলাকাগুলোতে ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন করতেন, যা তাকে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বৃহস্পতিবার সকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, শাহ জামাল এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের আলগার চরে অবস্থান করছেন। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ফুলছড়ি থানার একটি বিশেষ দল চরাঞ্চলে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ঘেরাও করে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় বাহিনীটি। গ্রেপ্তারের পর তাকে কড়া পুলিশি পাহারায় ফুলছড়ি থানায় নিয়ে আসা হয়।
শাহ জামাল মিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্যমান মামলার বিবরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার অপরাধের ব্যাপ্তি কেবল নিজ জেলায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ১. হত্যা মামলা: প্রতিবেশী জেলা জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা রয়েছে, যেখানে তিনি অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত। ২. চাঁদাবাজি ও দস্যুতা: ফুলছড়ি থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজি ও লুটতরাজের মামলা রয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের। ৩. অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধ: এছাড়াও দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে আরও পাঁচটি মামলা তদন্তাধীন বা বিচারপ্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুরুল হোদা মোবাইল ফোনে অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “শাহ জামাল মিয়া একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী এবং পেশাদার মামলার আসামি। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ মোট আটটি মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর আজ আমরা তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি।”
পুলিশ সূত্রে আরও জানানো হয়েছে যে, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে যা অন্যান্য মামলার তদন্তে সহায়ক হতে পারে। ২০২৬ সালের ১ মে, শুক্রবার সকালে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে গাইবান্ধা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হবে। পুলিশ তার রিমান্ড আবেদন করবে কি না, তা আদালতের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে। বর্তমানে শাহ জামাল মিয়া ফুলছড়ি থানা হাজতে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।
এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের মতে, শাহ জামালের গ্রেপ্তারে এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে। চর অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন জনপদে সাধারণ মানুষ প্রায়শই এ ধরনের প্রভাবশালী অপরাধীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। বিশেষ করে নদীবেষ্টিত ইউনিয়নগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে শাহ জামালের মতো ব্যক্তিরা অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। প্রশাসনের এই সময়োচিত পদক্ষেপ চরাঞ্চলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।