খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
রাজধানীর মিন্টো রোডে সরকারি উচ্চপদস্থ সচিবদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটগুলোর সুযোগ-সুবিধা এবং জৌলুস যেকোনো আন্তর্জাতিক মানের বিলাসবহুল হোটেলকেও হার মানাবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি, ২০২৬) তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে তিনি রাষ্ট্রের এই অহেতুক ব্যয় ও অপচয় নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, ব্যয়ের এই বিশাল খতিয়ানের কোনো জবাবদিহি নেই, যা সুশাসনের পথে প্রধান অন্তরায়।
হোসেন জিল্লুর রহমান তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্রের কাঠামোগত অদক্ষতার তিনটি প্রধান দিক তুলে ধরেন। প্রথমত, অর্থায়ন-সংকট; দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার ঘাটতি; এবং তৃতীয়ত, ক্ষমতাবানদের ‘অহমিকা’ প্রদর্শনের প্রকল্প। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিপুল হারে বেতন বাড়ানো হলেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হারের কোনো দৃশ্যমান উন্নতি কেন ঘটেনি। এছাড়া, আইসিটি পার্কের মতো বড় বড় প্রকল্পগুলো এখন অব্যবস্থাপনার কারণে কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দিয়ে দারোয়ানদের বেতন মেটাতে হচ্ছে—একে তিনি রাষ্ট্রীয় চিন্তার ‘ক্যানসার’ হিসেবে অভিহিত করেন।
রাষ্ট্রীয় অদক্ষতা ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জসমূহ:
| অদক্ষতার ক্ষেত্র | প্রভাব ও বাস্তব উদাহরণ | প্রস্তাবিত সংস্কার |
| সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতা | বিমান পরিচালনা পর্ষদে হুট করে ৩ জনকে নিয়োগ; যার কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা নেই। | নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও যৌক্তিক কারণ প্রকাশ করা। |
| অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প | অনেক আইসিটি পার্ক এখন অকেজো; যা কেবল লোকদেখানো প্রকল্প হিসেবে টিকে আছে। | ব্যয়ের কার্যকারিতা যাচাই করে প্রকল্প গ্রহণ করা। |
| পরিচালন ব্যয়ের অপচয় | সচিবদের জন্য হোটেল সদৃশ বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও উচ্চ বেতন-ভাতা। | অপচয় কমিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা। |
| ডিজিটালাইজেশনের অভাব | কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আংশিক ডিজিটাল হলেও তা এখনো জটিল ও কাগজনির্ভর। | পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা। |
সংলাপে সিজিএস প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকার ‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের’ প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এটি ‘ইতিহাসের নিকৃষ্টতম নির্বাচনে’ পরিণত হতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা রুটিন কাজের বাইরে, যা মূলত একটি রাজনৈতিক সরকারের নেওয়ার কথা। এতে সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে সন্দেহের দানা বাঁধছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য সায়মা হক বিদিশা বলেন, ডিজিটালাইজেশন দুর্নীতি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, তবে এর জন্য নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো অপরিহার্য। অন্যদিকে, র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ এমপি-মন্ত্রীদের জন্য ‘ট্যাক্স-ফ্রি’ গাড়ির সুবিধা এবং অতিরিক্ত লোকবল রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে ভিন্নমত পোষণ করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের এমপিদের বেতন-ভাতা কম, তাই তাঁদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো উচিত—তবে শর্ত হলো সংসদ সদস্য পদটি যেন ব্যবসায়িক তদবিরের মাধ্যম না হয়ে পূর্ণকালীন জনসেবার পেশা হয়।
নীতি সংলাপে বক্তারা একমত হন যে, বাংলাদেশে দুর্নীতির বহুমাত্রিক রূপ রয়েছে যা কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। সংস্কারের জন্য গঠিত বিভিন্ন কমিশন এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেনি। এমনকি সাধারণ ট্রাফিক ব্যবস্থার মতো মৌলিক নাগরিক সেবাতেও বর্তমান প্রশাসন দৃষ্টান্ত স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। মানুষের আস্থা ফেরাতে হলে কেবল প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি পয়সার ব্যয়ের ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।